ছোটগল্প: ভাঙাবাসা
ভাঙাবাসা
মোহাম্মদ আব্দুল আউয়াল
পর্ব ০১
আমার বাবা কিছুদিন আগে মারা গেছে। বাবার এই হঠাৎ করে মারা যাওয়ার কারণে আমাদের পরিবার বড় একটা ধাক্কা খায়। আমি ও আমার ছোট ভাই ও আমার মা পরিবারে রইলাম। বাবা মারা যাওয়ার পর বাবার জমানো টাকার পরিমানও আস্তে আস্তে কমতে থাকে। মায়ের একার পক্ষে যে সংসার চালানো সম্ভব হচ্ছে না তা আমি এখন বুঝতে পারছি। তাই একদিন সিদ্বান্ত নিলাম আমারা পুরো পরিবার মিলে ঢাকায় চলে আসবো। তারপর একটা ছোটখাটো জব নিয়ে পরিবারের হাল ধরতে হবে। যেই ভাবা সেই কাজ।
এর পর মায়ের অনুমতি নিয়েই আমি, ভাই, আর আমার মা চলে আসলাম শহড়ে। বাবার সাথে যখন ঢাকায় আসতাম তখন ঢাকাটা অন্যরকম ছিলো। বড় বড় দালানের দিকে তাকিয়ে থাকতাম। অবাক হয়ে ভাবতাম মানুষ এত্তো বড় বড় ঘড় কিভাবে বানায়? তখন শুধু শহরের জাকজমকটাই দেখতাম। রাস্তায় ল্যাম্পোষ্টের বাল্ব, চায়ের দোকান, হকার, সবখানেই কেবল সুখ দেখতাম। শহরের প্রতিটা জিনিসই দেখতে দারুন লাগতো। কিন্তু আজকে আমার চোখ খুলে গেছে। এটাও তাহলে শহরের রূপ হতে পারে? কেন যানি রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা টিপটিপে আলো জ্বলা ল্যাম্পপোষ্টটা দেখে বড্ড কান্না করতে ইচ্ছে করলো। শুধু মনে হচ্ছিলো, এই বয়সে বাবা চলে গিয়ে বড্ড অন্যায় করে ফেলেছেন। ছোটখাটো একটা রুম নিলাম প্রথমে। তারপর ছোট ভাইকে আর মাকে রেখে শুরু হয়ে গেল আমার চাকরি খোঁজা। কোথায় যাবো এই শহরে? সবাই ব্যাস্ত। পত্রিকা কিনে সেখান থেকে নানান জায়গায় আবেদন করে পাঠালাম।
ছোট ভাই কেবল দশম শ্রেনীতে পড়ে। অনেক ভালো ছাত্র ও। বাবা মারা যাবার পরে ওও অনেক ভেঙে গিয়েছিলো। পড়াশুনায় পিছিয়ে গেল কয়দিনের মধ্যে। যেভাবেই হোক এখন ওর ঘুড়ে দাঁড়ানোর সময়। কোনভাবে একটা স্কুলে ওকে ভর্তি করিয়ে দিতে হলো। টিউশনির জন্য ছোটখাটো বিজ্ঞাপণ বানালাম। শহরের কোথাও কোথাও টানিয়ে দিলাম। এত্তো এত্তো সুন্দর বিজ্ঞাপনের ভিড়ে নিজের সাদামাটা বিজ্ঞাপনটা দেখাই যাচ্ছে না। তবুও কিছু করার নেই। এই বিজ্ঞাপনের শহরে ছোট্ট এই কাগজটা কারো চোখে পড়লেই হয়। কিন্তু কথায় আছে না? যখন সাহায্য সব দিক থেকে বন্ধ হয়ে যায় তখন অন্য দিক দিয়ে ভাগ্য খুলে যায়। আমার ক্ষেত্রেও তাই হলো। তিন চার দিন পর কিছু ফোন পেলাম। তাদের ছেলেমেয়েকে পড়াতে হবে। সেদিনের পর থেকে শুরু হলো আমার পরিবারের জন্য সগ্রাম। তখন বিশ্বাস করতে শুরু করলাম যার সাহায্য করার কেউ নেই তার একমাত্র সৃষ্টিকর্তাই পাশে আছে।
আমার ডেইলি রুটিন হলো সারাদিন টিউশনি করানো আর চাকরির চেষ্টা করা। নিজের পড়াশুনাটাকে আর মনে হয় এগিয়ে নেওয়া হবে না। এখানেই ফুলস্টপ দিতে হবে। কারণ পড়াশুনার জন্য যে খরচটা সেটা চালানোর মতো সাধ্য আমার বাবার সঞ্চিত টাকা দিয়ে সম্ভব না এবং টিউশনি বাদ দিয়ে পড়তে হবে। ছোট ভাইকে আগে বাবার কাছে নানার ধরনের আবদার করতে দেখতাম। কিন্তু ইদানিং দেখছি ও আমার সাথে কথা বলতে চায় না। আমাদের মধ্যে কি দূরত্বটা অনেক বেড়ে গেছে? আগে তো এমন ছিলো না? ইচ্ছা করলে ও তো আমার কাছেই আবদার করতে পারে। কিন্তু করে না। আমার কাছে কিছু চাইলেই ওকে সেটা এনে দেওয়ার চেষ্টা করবো। আমার সমস্ত কষ্ট তো ওদের জন্যই করতে হচ্ছে।
দেখতে দেখতে শহরের এই ভাঙা বাড়িতে দুইটা মাস কেটে গেলো। আগে মাকে দেখতাম নানান কিছু নিয়ে ব্যাস্ত থাকতো। এখন ঘড়ের ভিতরেই সারাক্ষন বসে থাকে। এভাবে বসে থাকতে থাকতে একসময় দেখা গেলো, মা আর আগের মতো হাটতে পারছে না। পা ফুলে যাচ্ছে। ডাক্তার দেখালাম, বাত রোগ। পায়ের হাড্ডি ক্ষয় হয়ে যাচ্ছে। আজকে প্রথম বুঝতে পারলাম আমার মায়ের বয়স হয়ে গেছে। হঠাৎ একদিনেই বয়স বেড়ে যায় এভাবে? আমার তাই মনে হলো। কিছু কিছু জিনিস আস্তে আস্তেই বাড়ে। কিন্তু আমাদের হঠাৎ নির্দিষ্ট একটা দিনে নজর পড়ে। অনেক দিন চেষ্টা করেও একটা চাকরির জোগার করতে পারলাম না। তবে টিউশনির টাকা দিয়ে যে এক্কেবারে খুব খারাপ চলতে পারছি তা নয়। গার্ডিয়ান আর ছেলেদের সাথে কথা বলে ভালোই কিছু টিউশনি যোগার করে ফেলেছি। একদিন একটা ইন্টারভিউয়ের মেইল আসলো। চাকরিটা অনেক ভালো। এবং আমার সেই পরিমান যোগ্যতাও আছে। যদিও এর আগেও অনেক জায়গা থেকে এরকম মেইল অনেক এসেছে তাই এটারো আশা প্রায় ছেড়েই দিয়েছিলাম। কিন্তু আমার ভাগ্যটা যে সেদিন খুলে গেল সেটা কে জানতো? ইন্টারভিউয়ে প্রতিটা উত্তর সঠিক হলো। অবশেষে তারা আমাকে বলল, তাহলে নেক্সট উইক থেকে আমাদের কম্পানিতে জব শুরু করতে পারেন। হ্যাভ এ গুড জার্নি টু আওয়ার ক্যাম্পানি।
সেদিনের খুশি প্রকাশ করার মতো ভাষা কোন অভিধানেই নেই। আমাদের পরিবারটাকে নতুনভাবে শুরু করতে পারবো ভেবে আমার প্রচন্ডরকমের ভালো লাগছিলো। ছোট ভাইটার একটা গতি হবে ভেবে দারুন লাগলো। সেদিনই ভেবে রাখলাম, নিজেকে যেই যায়গাতে কল্পনা করতাম ওকে সেখানে বসানোর চেষ্টা করবো, যদিও প্রতিটা মানুষের শখ আলাদা। তবে আমি এটা আশা রাখতে পারি, ও আমাকে হতাশ করবে না।
স্যালারির প্রথম বেতন দিয়ে সকলে মিষ্টি খাওয়ায়। কিন্তু পকেটে টিউশনির কিছু টাকা ছিলো। সেগুলা দিয়ে মিষ্টি কিনে বাড়িতে গেলাম। আমি খেয়াল করলাম এরকম খুশি আমি এর আগে কখনো হই নি। আচ্ছা, পুরুষ মানুষেরা চাকরি পেলে কেন এতো খুশি হয়?
বাড়িতে গিয়ে চাকরির খবরটা মা আর ভাইকে দিলাম। ভাই আনন্দে লাফিয়ে উঠল। মায়ের চোখটা জ্বলজ্বল করে উঠলো। প্রথম মিষ্টিটা মায়ের মুখে তুলে দিলাম। মায়ের দুইটা গালে নিজের হাতটা রেখে বললাম, আজকে থেকে তোমাদের কোন কষ্টের মধ্যে রাখবো না। আমাদের সমস্ত সমস্যা আস্তে আস্তে ঠিক হয়ে যাবে দেখো। ছোট ভাইকে বললাম, তুইও আর চিন্তা করবি না। কোন কিছু লাগলে আমাকে বলবি। আমি সেটা পুরণ করে দেওয়ার চেষ্টা করবো। ছোট ভাই বলল, সেটা নিয়ে তুমি চিন্তা করো না ভাইয়া। তুমি ভালো থাকলেই আমরা ভালো থাকবো।
তারপর থেকেই শুরু হলো আমাদের অন্যরকম একটা যাত্রা। বেতন যথেষ্ট ভালোই। পরিবারের খরচ চালিয়ে কিছু টাকা জমানোও শুরু করলাম। পরিবারের কোন অভাব রাখতে দেই নি। যখন বাবা বেঁচেছিলো তখন নিজেকে পুরো নায়কের মতো দেখা যেন। সারাক্ষন বন্ধুদের সামনে আড্ডায় পরিপাটি হয়ে থাকতাম। এই সময়টাতে এসে লাস্ট কবে আয়নার দিকে তাকিয়েছি তাও জানি না। এখন নিজের যত্নের চাইতে পরিবারের যত্ন নেওয়া বেশি শিখে গেছি। একসময় দেখলাম মায়ের বাতের ব্যাথা আরো ভালোই বেড়েছে। তাই এইবার আর দেড়ি করলাম না। ভালো একটা ডাক্তার দেখিয়ে মায়ের চিকিৎসাটা করে ফেললাম। ডাক্তার অনেক অসুধপত্র দিয়ে আমাকে বললেন, উনার যথেষ্ঠ বয়স হয়েছে। এইবার উনাকে সকল কাজে ক্ষান্ত দিতে হবে। আর কোন ভাড়ি ধরনের কাজ করতে পারবেন না। সকালবেলা হাটাহাটি করবেন নিয়মিত যাতে শরির ভালো থাকে। কিন্তু ভাড়ি কোন কাজ আর তাকে দিয়ে করানো যাবে না।
শেষমেষ মায়ের কথাতেই ভাবলাম এইবার তাহলে বিয়েটা করেই ফেলতে হবে। কিন্তু এই শহরে আমাদের কয়জনে চিনে? আমরাই বা চিনি কয়জনকে? কোন মেয়ে ভালো হবে তার কিছুই জানি না। ভাবলাম, সব কিছুর পাশাপাশি নিজের ভবিশ্যতের দিকেও একটু খেয়াল রাখা দরকার ছিলো। যার কারণেই এখন এই অবস্থা। কোন মেয়ে আমাকে পছন্দ করে কিনা তাও আমার জানা নেই। আমার কাকে ভালো লাগে তাও আমি জানি না। গ্রামে থাকলে একটা মেয়েকে আমার প্রচন্ডরকমের ভালো লাগতো। কিন্তু এখন আর সম্ভব না। শেষমেষ সুন্দর একটা কথা মনে পড়লো। আমি যেই ছেলেকে আগে টিউশনি করাতাম তার একটা বড় বোন ছিলো। মোনালিসা নাম মেয়েটার। দেখতেও তো খারাপ ছিলো না। কেন যে তখন বিশেষ নজরে তাকাইনি। কোনভাবে তখন যদি মেয়েটাকে মায়ায় ফেলতে পারতাম? কিন্তু মোনালিসার আগেও কোন বয়ফ্রেন্ড আছে কিনা তাও জানি না। শেষমেষ মোনালিসাকেই বিয়ের প্রস্তাব দিলাম। বিয়েতে ওর বাবা-মা খুব সহজেই রাজি হয়ে গেল। রাজি হওয়ারই কথা। আমাকে তারা অনেক দিন থেকেই চিনে। তাদের ছেলেটাও যঠেষ্ট ভালো স্টুডেন্ট এখন। এর পেছনে পুরো ক্রেডিট এখন আমারি। তাই মোনালিসাকে বিয়ে করতে আমাকে কোন ধরনের বেগ পেতে হলো না। খুব ধুমধাম করেই আমাদের মধ্যে বিয়ে হয়ে গেল। মা-ও মেয়েটাকে অনেক পছন্দ করলো। এতো সুন্দরী আর গুনবতী একটা মেয়ে। কারো পছন্দ না হয়ে কোথায় যায়? মায়ের এখন থেকে আর কোন কঠিন কাজ করতে হবে না। আমিও আমার একটা বউ পেলাম আর আমার মা-ও একটা মেয়ে বান্ধবী পেল। এর চেয়ে সুখের সংসার আর কার হতে পারে? তাই আর মনের মধ্যে কোন চিন্তা রাখলাম না। মনে হচ্ছিলো জীবনের এই সময়টা এসে আমি অনেক কিছুই পেয়ে গেলাম। ছোট ভাইয়ের সুখ। একটা নতুন পরিচিত মুখ। মায়ের মুখের হাসি। জীবনে আর কিছুই পাওয়ার রইলো না।
কিন্তু মানুষের জীবনটা যে এতো বৈচিত্রময় হতে পারে তা আগে আমি কখনোই জানতাম না। দেখতে দেখতে তিনটা বছর জলের মতো পার হয়ে গেল। কিভাবে পার হলো সেটা নিজেও অনুধাবন করতে পারলাম না। ছোট ভাই স্কুল ছেড়ে কলেজে উঠে গেল। ওর চাহিদাও বড় হচ্ছিলো আর নিজেও কিছু টিউশনি যোগার করে নিজের হাতখরচ বহন করা শুরু করলো। ছোট ভাইটা চোখের সামনে এই কয়দিনে এতো বড় হয়ে যাবে তা কল্পনাও করতে পারি নি। আসলেই যাদের বাবা থাকে না, প্রকৃতি নিজের মধ্যেই বাবার দায়িত্ব ও ক্ষমতা এনে দেয়। শুনেছিলাম প্রকৃতি নাকি শুন্যতা পুরণ করতে ওস্তাদ।
তিনটা বছরে মায়ের শরির অনেকটা দুর্বল হয়ে গেছে। আগের মতো চলাফেরা করতে পারে না। চুলে পাক ধরছে। এখন আর এই মহিলাকে দেখে কেউ বলবে না যে কিছু বছর আগেও সে প্রচন্ডরকমের কর্মঠ ছিলো। মাঝে মাঝে মায়ের চোখের দিকে তাকিয়ে বড্ড মায়া হয়। মনে হয় এত্তো এত্তো কষ্ট করে দিনশেষে নিজের জন্য কী পেল? সবকিছুই তো করলো অন্য কয়েকটা জীবনের সুখের জন্য। সত্যিই মায়েদের এই গুনটা যদি পুরো পৃথিবীর মানুষেরই থাকতো তাহলে পৃথিবীটা আজকে কত্তো সুন্দর হতো? কিন্তু কেন যে সবাই বিষয়টা বুঝে না।
কিছুদিন ধরে শরিরটা খারাপ যাচ্ছে। শরির দুর্বল হয়েছে অনেক। শরির দুর্বল হওয়াটাই তো স্বাভাবিক। একটা শরিরের উপর দিয়ে এতোটা শারীরিক ও মানসিক ঝড়। প্রতিটা মানুষেরই শরির খারাপ হওয়ার কথা। অফিসে গেলে সারাক্ষন ঘুম ঘুম লাগে। রাতেও বাসায় আসলেও কারো সাথে কথা বলতে ইচ্ছা করে না বেশি। কি যে হলো আল্লাহ জানে। ডাক্তার দেখিয়ে শরির দুর্বলতার কথা বললে তিনি সামান্য কিছু ভিটামিন লিখে দিলো। সেগুলা খেয়ে কিছুটা ভালো থাকি। কিন্তু পুরোপুরি উপকার পাচ্ছি না। বিশেষ করে অফিসে গেলে যখন নিজের হাত দিয়ে কিছু লিখি। তখন লিখতে অনেক কষ্ট হয়। হাত পা কাঁপছে ইদানিং। প্রথম প্রথম ভেবেছিলাম খাওয়াদাওয়া ঠিক মতো করলেই হয়তো ভালো হয়ে যাবো। কিন্তু তেমনটা হলো না। শরির আরো দুর্বল হতে লাগলো। অফিসের কাজ ভালোভাবে করতেই পারছি না। কলিগরা বড় কোন ডাক্তার দেখাতে বলল। অফিসের বস মাঝে মাঝেই রাগ করে বলতে লাগলো, এই অবস্থায় অফিস করলে তো আমার কম্পানি লাটে উঠবে।
প্রথম প্রথম আমার কাজের দক্ষতা দেখে যেই মানুষটা সারাক্ষন আমার কাজের প্রশংসা করতো। সেই একই লোক আমাকে এই সময় একটুও সাপোর্ট দিচ্ছে না ভেবে সত্যিই মনে মনে অনেক কষ্ট পেলাম। এতোদিনে বুঝতে পারলাম, জীবনে বড় কিছু হতে গেলে আসলেই ভালোবাসাকে মুল্য না দিয়ে টাকাকে মুল্য দিতে হয়। সব সম্পর্ক ছিন্ন করে যদি টাকার পেছনে ছুটতাম। তবে টাকা হয়তো পেতাম। ভালোবাসা পেতাম কিনা জানি না। কিন্তু জীবনের এই সময়টাতে এসে টাকা এবং ভালোবাসা কোনটাই পাচ্ছি না। সংসারের খরচ আরো বাড়ছে। মায়ের প্রেস্ক্রিপশনে আরো কিছু নতুন অসুধ যুক্ত হয়েছে। ছোট ভাই আরো বড় হয়েছে।
শেষমেষ মোনালিসাকে নিয়ে চলে গেলাম ঢাকার বড় হাসপাতালে। সেখানে ডাক্তার দেখালাম। আমার সমস্ত সমস্যার কথা ওনাকে বললাম। কিছু টেস্ট দিলো। সবগুলো করালাম। ভেবেছিলাম, এইবারো ব্যাতিক্রম কিছু হবে না। স্বাভাবিক শরির দুর্বলতা। কিছু অসুধ দিবে এক মাসের মধ্যেই সব ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু সেবার আমার ভাগ্য যে পুরোটা আমার বিপক্ষে ছিলো তা জানতাম না। ডাক্তার মুখ ভাড়ি করে বললেন, আপনার সমস্যা তো অনেক জটিল। নিজেকে শক্ত রাখতে পারবেন আশা করি। আমার মাথা যেন ভন ভন করতে লাগলো। কি বলবেন এখন উনি? আমি মোনালিসার দিকে তাকালাম, দেখলাম মোনালিসাও ডাক্তারের দিকে হা করে তাকিয়ে আছে। ডাক্তার অবশেষে বললেন, আপনার রোগটার নাম হলো: ALS বা Amyotrophic Lateral Sclerosis. এটা হলে শরির আস্তে আস্তে তার কার্যক্ষমতা হাড়িয়ে ফেলে।
: এটা ভালো করার কোন উপায় নেই?
: আসলে কষ্টের সাথে বলতে গেলে, "না" এখনো এটা ভালো করার কোন চিকিৎসা আবিষ্কার হয় নি।
: তাহলে এখন কিভাবে কি করবো? আমার তো নিয়মিত অফিসে যেতে হয়, লেখালেখি, টাইপিং সহ অনেক কাজ করতে হয়। আমি শক্তি পাই না। হাত পা কাঁপাকাঁপি করে।
: চিন্তা করবেন না। কিছু অসুধ লিখে দিবো আপনাকে। পুরোপুরি ভালো হবে না ঠিক আছে। কিন্তু অসুধগুলো এই প্রক্রিয়াকে ধীর করে দিবে।
আমি মোনালিসার দিকে তাকিয়ে দেখলাম, মেয়েটার চোখে পানি। আমি ডাক্তারের প্রেস্ক্রিপশনটা নিয়ে ওকে সাথে নিয়ে বাইরে চলে আসলাম। বার বার বুঝিয়ে বললাম, তুমি ভয় করো না। ডাক্তার অসুধ দিয়েছে তো। নিয়মিত খেলে হয়তো কমে যাবে। কিন্তু মেয়েটার কান্না থামছে না। হয়তো কষ্ট লাগছে ভীষন। কিন্তু ওর থেকে তো আমারো বেশি কষ্ট হচ্ছে। শরিরটা তো আমার নিজের। কিন্তু আমার কান্না আসছে না। বেশি কষ্ট পেলে যে আসলেই মানুষের কান্না করার ক্ষমতা হাড়িয়ে ফেলে সেটা আজকে প্রথম বুঝতে পারলাম।
এভাবেই কিছুদিন পার হয়ে গেল। অফিসে যাই। কিছু কলিগদের বললাম আমার অসুখের কথা। কথাটা শুনে সবাই কষ্টই পেল। কারণ এই কদিনে আমি অফিসের সবারই মন মজিয়ে ফেলেছিলাম। কিন্তু আমি জানি আমার এই অসুখের কথা বসের কানে কখনোই ঢুকানো যাবে না। জানলে নির্ঘাত আমার চাকরির এখানেই শেষ টানতে হবে। কিন্তু কিছু কথা কি গোপন রাখা যায়?
আরো কয়েকটা বছর যাওয়ার পরেই যখন অফিসের বস দেখতে পেল আমার প্রোডাকটিভ ক্ষমতা আগের থেকে অনেক কমে গেছে। তখন তিনি নানান বাহানা আরাম্ভ করলেন।
একদিন কাজ করার সময় একটা সুন্দর র্যাপিং পেপারে মোড়া একটা গিফটের মতো কিছু দিয়ে গেল। মনে হচ্ছে নিশ্চিত কোন গিফট ভেতরে। যদিও হালকা। আমি আশেপাশে তাকিয়ে দেখলাম কেউ আমাকে দেখছে কিনা। নাহ। কেউ দেখছে না। এখন ভেতরে কি আছে খোলা যেতে পারে।
ভেতরে খুলে দেখলাম ভেতরে ভালোই অনেকগুলা টাকার বান্ডিল। কারো কাছে কোন টাকা পাবো কিনা সেটা ভাবতে শুরু করলাম। কিন্তু আমার মনে পড়লো না। টাকাগুলোর নিচে দেখলাম সুন্দর করে প্রিন্ট করা একটা চিঠি। সেটা বের করে পড়তে আরাম্ব করলাম।
প্রিয় আদনান আহমেদ,
আপনাকে জানানো যাচ্ছে যে, আপনার বর্তমান অসুস্থতার কারণে আমাদের কম্পানি একটা মারাত্বক লোকসানের দিকে যাচ্ছে। যেখানে আপনি আপনার বেতনের থেকে অনেক সামান্য কাজ করছেন। যার ফলে আপনার চাকরিটা এখানেই সমাপ্ত দিতে হবে।
প্রতিষ্ঠান আপনার অবদানের জন্য ধন্যবাদ জানাচ্ছে। আপনার বকেয়া বেতন ও কিছু উপহারস্বরুপ কিছু সাহায্য দেওয়া হলো। দয়া করে তা গ্রহন করবেন আশা করি।
চিঠিটা পড়ার জন্য মোটেও আমার কোন প্রস্তুতি ছিলো না। যেন কিছুক্ষনের জন্য মনে হচ্ছিলো আমি বাস্তব দুনিয়া থেকে অনেকটুকু হাড়িয়ে গেছি। আমি নিজেকে এখানে আর কল্পনা করতে পারছি না। মনে হচ্ছিলো আমার পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে গেছে। এমন পরিস্থিতিতে এর আগে আমি জীবনেও পড়ি নি। ফ্যামিলিতে মা, মায়ের অসুধ, স্ত্রী, ছোট ভাই এদের কি অবস্থা হবে আমার চাকরি না থাকলে? কিভাবে চলবে আমার পরিবারটা?
সেদিন বাসায় এসে আর খাওয়াদাওয়া করলাম না। চুপচাপ বিছানায় এসে শুয়ে পড়লাম। কারো সাথে কোন কথা বললাম না। মোনালিসার সাথেও না। মেয়েটা অনেক রাতে রুমে এসে আমাকে ডাকতে লাগলো, খাবে না? এতো আগেই শুয়ে পড়লে যে? আমি কোন কথা বললাম না। চুপচাপ শুয়েই আছি। তখনো আমার পুরো মাথাজুরে পরিবারের চিন্তা। অল্প বয়সে বাবা আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন। পুরো দায়িত্বটা আমার উপরে দিয়ে গিয়েছিলেন। এখন যদি সেটা রাখতে না পারি। মনে হচ্ছে এর চেয়ে হয়তো মরে যাওয়াই ভালো ছিলো।
মোনালিসা চুপচাপ আমার পাশে এসে শুয়ে পড়লো। যখন অনেক রাতেও দেখলো আমার চোখ খোলা। তখন ওর একটা হাত আমার মাথায় রেখে বলল, কি হয়েছে তোমার? আজকে ঘুমাচ্ছো না কেন? মোনালিসার এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়া আমার জন্য মোটেও সহজ নয়। আমার চোখ আজকে অনেকদিন পর ভিজে গেল। আমি আমার গলাটা শক্ত করলাম। তারপর বুকে ভাড়ি একটা পাথর জমা রেখেই বললাম, "আমার চাকরিটা চলে গেছে মোনালিসা। ওরা আমাকে আর চাকরিতে রাখলো না।"
পর্ব ০২
পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠলাম। ঘুম থেকে উঠেই প্রথমে মনে হলো আজকে থেকে তো আর অফিসে যেতে হবে না। রাস্তার ধোয়া, লোকাল বাসের ভীড়, এসবের কোন কিছুর সাথেই আর নতুন করে দেখা হবে না। এরকমটা যে আমার সাথে হবে তা আগে কে জানতো? মোনালিসা অনেক আগেই ঘুম থেকে উঠে পড়েছে। কিছুদিন ধরে দম বন্ধ লাগে। ফাফর করে আর নিশ্বাস নিতে অনেক কষ্ট হয়। তাই মাঝে মাঝে কাশি দিতে হয়। ঘুম থেকে উঠেই প্রচন্ড কাশি। শব্দ শুনে মোনালিসা রুমে আসলো। এসেই বলল, উঠেছো? কাশিটা অনেক বেশি হয়েছে দেখা যাচ্ছে। একটু চা করে দেই?
অনেকদিন পর চায়ের কাপ নিয়ে বারান্দায় বসলাম। নিজেকে একটা খাঁচার ভেতরের বন্ধি কয়েদিন মতো মনে হচ্ছে, যার কিছুদিন পরেই ফাঁসি হবে। ভেবেই কেমন জানি লাগছে আমার। মোনালিসা কি সবাইকে বলেছে যে আমার চাকরি চলে গেছে? মা কি জানে যে তার ছেলেটাকেও এখন থেকে তার মতো বাসায় শুয়ে বসে কাঁটাতে হবে?
দুপুরের দিকে মোনালিসা আমাকে আবার হাসপাতালে নিয়ে গেল। বাইরের জগৎটা আমার কাছে আজকে অন্যরকম মনে হচ্ছিলো। হাটতে অনেক কষ্ট হচ্ছিলো। তাই একটা রিকশা নিলাম। বুঝতে পারলাম, এই সাত দিনে আমার শরির আগের থেকে দশগুন দুর্বল হয়ে গেছে। যেই লোকটা বাসে ভিড়ের মধ্যে যাতায়াত করতো। এখন সেই লোকটা সামান্য রিকসাতে উঠতেই কষ্ট হয়।
ডাক্তারের সাথে কথা বলে জানতে পারলাম, আমার শরিরে কার্যক্ষমতা আসলেই প্রচন্ডরকমভাবে কমে যাচ্ছে। বার বার কাশি হওয়ার কারণ হলো ফুসফুসেরও কার্যক্ষমতা কমে যাচ্ছে। যার কারণে শরির বাতাস পাচ্ছে না। তাই বার বার কাশি আর দম বন্ধ লাগছে। ডাক্তার অক্সিজেন দেওয়ার সাজেস্ট করলো আর প্রেস্ক্রিপশনে আরো নতুন করে অনেকগুলো অসুধ সাজেস্ট করলো। এই অবস্থায় শরিরের চাইতে মানসিক অবস্থা খারাপ হবে বলে মন ভালো রাখার অসুধ দিলো।
সাত দিনের মধ্যে খেয়াল করলাম আমার একা বাথরুমে যাওয়া ক্ষমতাও হাড়িয়ে গেছে। মোনালিসাকে ধরে ধরে বাথরুমে যেতে হচ্ছে। মেয়েটার আসলেই অনেক কষ্ট হয়ে গেল। কতো আশা নিয়ে হয়তো এই বাড়িয়ে এসেছিলো। আমার জন্য সব আশাকে এখন শেষ করে দিতে হচ্ছে। বুঝতে পারলাম জীবনটা আমার আর চলতে চাইছে না। মনে হচ্ছে এখন যদি মরে যেতে পারতাম তবেই হয়তো ভালো হতো। কিন্তু মানুষের মরণ কি অনেক সহজ নাকি কঠিন?
মা এখনো ভালোই হাটাচলা করতে পারে। মাঝে মাঝেই আমার রুমে এসে বসে থাকে। নানান ধরনের গল্প করে। কান্নাকাটি করে। আমি আগের মতো বেশি কথা বলতে পারি না। কথা মুখের ভেতরে আটকে আটকে আসে। মনে হয় যেন, আস্তে আস্তে পুরো শরিরটাই যেন থেমে যেতে চাইছে। হাত-পা কোন কিছুই আর কাজ করতে চায় না। মোনালিসা মাঝে মাঝে আমাকে ধরে বাইরে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। বাইরে যাই। কিছুক্ষন বসে থাকি। তবে আমি বুঝতে পারছি, বাইরের আলোকে আমার অল্প দিনের মধ্যেই বিদায় দিতে হবে। এভাবে পায়ের সাথে যুদ্ধ করে বাইরে আসার কোন মানেই হয় না।
আমার দিনগুলো যে কিভাবে কাটছে তা বলে বুঝানো যাবে না। আমি জানি সবাই আমাকে অনেক ভালোবাসে। তবুও আমার মনে হয় আমি আস্তে আস্তে এই পরিবারের কাছে বোঝা হয়ে যাবো। তখন আমার কেমন লাগবে? এসব ভেবে সত্যি অনেক খারাপ লাগে আমার। এখন যদি কোনভাবে একটা যাদুর কাঠির মতো কিছু পেতাম, যেটা দিয়ে মনের সকল আশা পুরণ করা যেত তবে আমি নিজেকে ঠিক করে ফেলতাম। আবার অফিসে যেতাম। কিন্তু এরকমটা কখনোই হবে কিনা জানি না। হবে তো! মারা গেলেই হয়তো এসব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। মৃত্যুর দূত এসে যখন বলবে, চলো এবার আমার সাথে। তখন আমি হয়তো বলবো, কিভাবে যাবো? আমি তো হাটতে পারি না। তখন সে বলবে, আরে। একটু চেষ্টা করে দেখোই না। আমি তখন দেখবো, আমি দিব্বি হাটতে পারছি। বরং একজন সুস্থ মানুষের থেকেও অনেক ভালো। শরির এত্তো হালকা লাগছে। কোন ব্যাথা নেই, যন্ত্রণা নেই। মনে হবে আমি এখন ১০০% সুস্থ।
সারাক্ষন মুখে অক্সিজেন লাগিয়ে রাখতে হচ্ছে। বুক নিজ থেকে শ্বাস নেওয়ার ক্ষমতা হাড়িয়ে ফেলেছে। হাত পায়ের চামড়া কালচে হয়ে যাচ্ছে। কিছুদিন ধরে এক্কেবারেই নারাচারা করতে পারছি না। এক্কেবারে প্যারালাইজড রোগীর মতো হয়ে গেছি এই কদিনে। হাত পা ফুলে যাচ্ছে। শরিরের দিকে তাকালে ভয় করবে সবারই দেখে। মোনালিসা যে কেমন করে আমার কাছে থাকে কে জানে?
সেদিন শুনলাম। ছোট ভাইও নাকি চাকরির জন্য নানান জায়গায় আবেদন করা শুরু করেছে। ভেবেই খুব খারাপ লাগছে। যেখানে আমার সব কিছু করার দরকার ছিলো, সেখানে সকল দায়িত্ব এখন ওকে নিতে হচ্ছে। প্রচন্ডরকম কান্না করতে ইচ্ছে করলো। কিন্তু এই মুহুর্তে আমার আর কিছুই করার থাকলো না। ওর-ও একটা চাকরির ব্যাবস্থা হয়ে গেলে ভালোই হয়। নিজের সংসারটাও গুছিয়ে নিতে পারবে। ও মাঝে মাঝে আমার কাছে এসে বসে। ওর চেহাড়া থেকে মনেই হয় না কিছুকাল আগেও ও অনেক ছোট ছিলো। এই কদিনেই ও অনেক বড় হয়ে গেছে। মানুষ তাহলে পরিস্থিতির সাপেক্ষেই আস্তে আস্তে বড় হয়। ওর মুখ দেখে চেনাই যাচ্ছে না। এই কিছুদিন আগেই তো ওর জন্ম হলো। বাবা ওর নাম রেখেছিলেন, ইশান। কিন্তু আমি ওর নাম চেঞ্জ করে রাখলান ইভান। এখন ইভান বলেই সবাই চিনে। তবে বাবা মারা যাওয়ার আগ পর্যন্ত বাবা ওকে ইশান বলেই ডাকতো।
ইভানের একদিন চাকরি হয়ে গেল। আমাকে প্রথমে মা খবরটা দিলো। মা আনন্দের সাথে আমার কাছে এসে বলল, যানিস, ইভানের নাকি চাকরি হয়ে গেছে। আমি খুশিতে প্রায় আত্মহারা হয়ে গেলাম। মাকে বলতে ইচ্ছা হলো, সত্যি নাকি? এইটুকু একটা ছেলে, এই বয়েসেই চাকরি জুটিয়ে ফেলল। ওকে একটু আমার কাছে ডেকে দাও তো। কিন্তু দুঃখের বিষয় এই কদিনে আমার কথা বলার ক্ষমতা প্রায় ৯০% শেষ হয়ে গেছে। এখন শুধু আমি একটু হাসতে পারি, আর কান্না করতে পারি। ডাক্তার বলেছে, কিছুদিন পর হয়তো সেটাও বন্ধ হয়ে যেতে পারে। এই দুইটা ছাড়া মানুষ বাঁচবে কিভাবে? হাসি, কান্না ছাড়া কতদিন আর থাকা যায়?
মুখে সারাক্ষন অক্সিজেন লাগিয়ে রাখতে হচ্ছে। নিজে থেকে শ্বাস নিতে পারি না আর। আমার জন্য আমার পরিবারের খরচ আরো বাড়তে থাকলো। এভাবে তো আর চলছে না। পরিবারের সব খরচ এখন ছোট ভাইটার কাঁধে চলে এসেছে। অসুখের শুরুর দিকে সবাই আমার পাশে থাকার চেষ্টা করতো। কিন্তু কিছুদিন ধরে কেউ আর সহজে আমার কাছে আসতে চায় না। মাঝে মাঝে মা আমার পাশে এসে বসে থাকে। মোনালিসা এসে মাঝে মাঝে আমাকে দেখে যায়। অক্সিজেনের মাক্স ঠিক করে রেখে আবার চলে যায়। সারাদিন কী করে কে জানে? সবার এতো ব্যাস্ততা দেখে আমার হিংসা হয়। নিজে তো কিছু করছি না। অন্যের ব্যাস্ততা দেখে পছন্দ হয় না। এতো কাজ কেন থাকবে সবার?
ঘড়ি দেখা হয়না অনেক দিন, আজকে কী বার? এটা কোন ঋতু? এসব আমি কিছুই জানি না। কতগুলা দিন যে পার হয়ে গেছে। আসলে দিন বললে ভুল হবে। অনেকগুলা বছর পার হয়ে গেছে। হিসেব তো রাখি না কিছুই। হিসেব রাখি না একবারেই তাও না। শরিরে এখনো অনুভুতি বোঝা যায়, নাকে ঘ্রাণ এখনো পাই। বর্ষাকাল এলে জানালা দিয়ে স্যাতস্যাতে মাটির গন্ধ, আর ওই পাশে হয়তো একটা কদম গাছ আছে। সেটা থেকে সামান্য একটু ঘ্রাণ পাওয়া যায়। তখন বুঝতে পারি বর্ষাকাল এসেছে। আবার শীত কাল আসলে তো আলাদা করে বোঝা লাগে না। শরিরই জানিয়ে দেয় যে শীতকাল চলে এসেছে। বুঝতে পারি এভাবে আমি প্রায় ৫ থেকে ৬ বছর পার করে ফেলেছি। ফ্যামিলির সবাই আমার মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করছে, বুঝতে পারলাম। এখন আর কেউ আসতে চায় না এই ঘড়টাতে। মোনালিসা খুব দূরত্ব বজায় রেখে বিছানায় ঘুমায়। এখন বুঝতে পারি ও আমাকে দেখে ইদানিং ভয় পায়। কারণ আমাকে দেখতে হয়তো পুরো মৃত লাসের মতো মনে হয়। একটা লাসের সাথে ঘুমানোর সাহস কার আছে?
একদিন রাতে হয়তো একটু সময়ের জন্য ঘুমিয়েছিলাম, ঘুম থেকে উঠে বুঝতে পারলাম মোনালিসা আমার পাশে নেই। কিন্তু মেয়েটার মৃদু চিৎকারের শব্দ কানে আসছে। কিন্তু মেয়েটা কোথায়? অনেকক্ষন পর বুঝতে পারলাম ইভানের রুম থেকে শব্দটা আসছে। আমার ধারণাই সঠিক। মোনালিসার কামনার চিৎকারে আমার বুকটা ফেঁটে যাচ্ছে। চোখ দিয়ে অজান্তেই পানি চলে আসলো। কিন্তু আমার চিৎকার করে কান্না করার শক্তি নেই। পানি মুছে ফেলারও শক্ত নেই। আমি এখনো মারা যাচ্ছি না কেন?
একটু পরে মোনালিসা রুমে আসলো। গুন গুন করে গান গাইছে এতো রাতে। যেন ও আজকে অনেক খুশি। ওর গা থেকে সুন্দর একটা পারফিউমের গন্ধ আসছে। এসেই ও আয়নার সামনে বসে এলোমেলো চুলগুলো আঁচরাতে লাগলো। শাড়িটা এলোমেলো করে পড়েছে। যেন খুব দ্রুত গা ঢাকার চেষ্টা করেছে। কিন্তু ওর এতো সুন্দর রুপ দেখে আমার অনেক খারাপ লাগছে। ওর তো কোন দোষ নেই। সব দোষ তো আমার। আমিই তো ওর যোগ্য স্বামী হতে পারি নি।
তবে নিজের মনকে শান্তনা দিলাম। আমি চলে গেলে যদি ইভানের সাথে মেয়েটা সুখে থাকতে পারে তবে খারাপ কিছু না। ওরা তখন বিয়ে করে নিবে হয়তো। দুইজনে প্রায় সমবয়সী।
এই জীবনে আমি আর কিছুই চাই না। শুধু এই শরির থেকে মুক্তি চাই। সবাইকে উদ্ধার করতে চাই। কিন্তু এভাবে আর কতদিন? আমি কবে মারা যাবো? এই হিসাবটাই মিলাতে পারছি না। আমার তো আর বাঁচতে ইচ্ছা করছে না। কত্তো স্বপ্ন ছিলো আমার। সব স্বপ্নই তো কবর দিয়ে ফেলেছি। স্বপ্নকে কবর দিয়ে ফেলা মানেই তো নিজেকে কবর দিয়ে ফেলা। নিজের মধ্যে আর কোন কিছুই অবশিষ্ঠ নেই।
মোনালিসাও আর আগের মতো কাছে আসে না। আমার কষ্টে ওর এখন আর মন খারাপ হয় না। আমার জন্য কারোই এখন মন খারাপ হয় না। ইভান দিনে সারাদিন অফিসে থাকে। রাতে রেস্ট করে। মোনালিসা সারাদিন বাসার কাজ করে। মা অসুস্থ। আমাকে দেখতে আসার মতো কেউ নেই। এক্কেবারেই যে দেখতে আসে না তা নয়। দরকারি কাজটা মোনালিসা করে দিয়ে যায়। তখনি একটু মেয়েটাকে নজরে পড়ে। ওকে দেখতে এখন একটু অন্যরকম লাগে। আমি বুঝতে পারি মেয়েটা আমার হয়েও এখন আমার না।
মানুষের যখন শরিরের অন্যান্য অঙ্গ বিকল হয়ে যায় তখন শরিরের বাকি অবশিষ্ঠ অঙ্গের ক্ষমতা বেড়ে যায়। যেমন ইদানিং আমি দেখছি, আমার ঘ্রাণশক্তি খুবই শক্তিশালী হয়েছে। তাছাড়া আমি এখনো স্পষ্ট দেখতে ও শুনতে পাই। কেউ যদি অন্য রুমে ফিসফিসিয়ে কথা বলে তবুও সেটা আমার কানে চলে আসে। ইদানিং বাড়িতে কি কথা হচ্ছে সব তথ্যই আমি জানি। আমাকে বাঁচিয়ে রাখার খরচ অনেক বেড়ে গেছে। কিন্তু বেঁচে থেকে তো কোন ফল হচ্ছে না। বিনিময়ে সংসারে আরো অশান্তি বাড়াচ্ছি। এখন এদের আমাকে বাদ দিয়ে নতুন করে জীবন গোছানোর সময়। মাঝখানে আমিই একমাত্র বাঁধা। আমি এখনো মারা যাচ্ছি না।
কিন্তু সেদিন রাতে মনে হয় স্বস্তির আভাশ পেলাম। ওরা ফিস ফিস করে কিছু আলোচনা করছে। আমি সবই বুঝতে পারছি। আমার এখন মন খারাপ হয় না। আবেগহীন একটা পাথরের মতো হয়ে গেছি। যে শুধু শুনে আর দেখে। ওদের আলাপ আমার কানে এসে বিঁধছে। বিঁধুক। যা ইচ্ছে হোক।
রাতের বেলা মোনালিসা আমার কাছে আসলো। এসেই আমার পাশে বসলো। অনেকদিন পর। ও সুন্দর করে শাড়ী পড়েছে। আরে। এটা তো বিয়ের শাড়ী। আমাদের যেদিন বিয়ে হলো। আজকে কি আমাদের বিবাহবার্ষিকী? দিন তারিখ তো কিছুই মনে নেই আমার। হবে হয়তো। মোনালিসা নিজ হাতে আমার জন্য পায়েস রান্না করেছে। আমার প্রিয় খাবার যে পায়েস সেটা ও ভালোই যানে। আমার অক্সিজেন মাক্সটা খুলে ও এক চামচ মুখে তুলে দিলো। এতো সুন্দর করে রান্না করতে পারে মেয়েটা? মনে হচ্ছে সর্গের কোন খাবার আজকে খাচ্ছি। আরো একটু খেলাম। অনেক দিন পর পায়েস খেলাম। ব্রেন্ডার করা যত্তসব খেয়ে আমার মুখটা প্রায় নষ্ট হয়ে গিয়েছিলো। আজকে সেই মুখ যেন প্রাণ ফিরে পেল।
মোনালিসা অক্সিজেন মাক্সটা আবার ভালো করে লাগিয়ে দিলো। আমি ওকে আমার চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছি। ও হাসছে। আমার চোখ বড় বড় হয়ে গেল। মুখে মাক্স থাকা সত্বেও আমার ফাফর করছে। মনে হচ্ছে কেউ আমাদ দম চেপে ধরেছে। শ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে। চোখ অন্ধকার হয়ে আসছে। অনেক চেষ্টা করে মোনালিসাকে দেখার চেষ্টা করলাম। কিন্তু হঠাৎ করে আমার সামনে থেকে সমস্ত দৃশ্য উধাও হয়ে গেল। বাহ্! আমি এখন যা কল্পনা করছি। তাই চোখের সামনে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি। চোখের সামনে দেখলাম মোনালিসা বউ সেজে আমার সামনে বসে আছে। বাসর রাতের কথা মনে পড়লো। মায়ের চেহাড়া মনে পড়লো। ছোট ভাইয়ের জন্মের সময় ওকে প্রথম কোলে নিয়েছিলাম। তখন ছোট্ট একটা বাচ্চা ছিলো ও। আমার দিকে তাকিয়ে কি যেন বলতে চাইছিলো। সেই ইভানের কথা মনে পরলো। তারপর আস্তে আস্তে সমস্ত কল্পনাগুলোও বাস্প হয়ে উড়ে যেতে লাগলো। আমি একটা শুন্যতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছি বুঝতে পারলাম। যাক! অবশেষে তো আমি মুক্তি পেলাম। আর ওরাও নতুন করে সংসার শুরু করবে হয়তো।



Comments
Post a Comment