অনলাইন জগতে আপনি যেভাবে একটা প্রোডাক্ট:

বর্তমানে আমাদের জেনারেশনের প্রতিটা মানুষের হাতেই স্মার্টফোন আছে। এর সাথে প্রতিটা স্মার্টফোনে আছে গুগলের নানার apps যেমন: গুগল ক্রোম, গুগল ফাইল, ইউটিউব, জেমিনাই ও তার সাথে আছে মেটার ফেসবুক, ইন্সটাগ্রাম ও নানান apps.


আপনি অবশ্যই খেয়াল করেছেন যে Youtube, Facebook কখনোই আপনাকে অপ্রয়োজনীয় এমন কোন ভিডিও পাঠাবে না যেটা আপনার দেখে বোরিং লাগবে। বরং আপনার নিজের সাথে সামঞ্জস্য ভিডিওগুলাই দেখানো নয়। যদি ফেসবুক ওদের ইচ্ছামতোন ভিডিও পাঠাতো তাহলে আমরা সেটা অতোটা পছন্দ করতাম না এবং ভিডিও দেখতাম না। ওরা আমাদের পছন্দেরই ভিডিও পাঠায়। এখন ওরা আমাদের পছন্দের কথা জানলো কিভাবে? এর উত্তরো আমরা সবাই জানি, আমাদের আগের সকল ভিডিওর হিস্ট্রি। সেটা দেখে সহজেই বোঝা যায় আপনি কোন ধরনের ভিডিও পছন্দ করেন। ফেসবুকে আমাদের যাবতীয় কাজ ও একটিভিটি মনিটর করা হচ্ছে। তবে ভয় পাবেন না। কোন মানুষ আপনার হিস্ট্রি দেখছে না। দেখছে কোন AI bot. এই বট আপনার কোন ক্ষতি না করেই আপনার কাছে থেকে গোপনে আপনার ডেটা সংগ্রহ করছে। আপনি কার পোস্টে কেমন রিয়েক্ট দিচ্ছেন। কার মতামতে কোন ধরনের কমেন্ট বা রিয়েক্ট করছেন প্রতিটা ডেটাই ওরা মনিটর করছে।


এখন আপনি আপনার ব্যাক্তিত্বের বিষয়ে কোন সাইকোলজিস্ট দেখান নি। যার ফলে আপনি শুধু আপনার বাইরের স্বভাবটাই দেখতে পান। কিন্তু মেটার কাছে আছে এক ধরনের সাইক্রিয়াটিস্ট বট। যেই বট আপনার সংগ্রহীত ডেটাকে বিশ্লেষণ করে আপনার আরো অনেক গোপন ডেটা বের করে ফেলতে পারে।


একটা মজার উদাহরণ দেওয়া যাক। ধরুন কিছু লোক A নামের একটা প্লে লিষ্টের গান বেশি পছন্দ করে। এবং এটাও জানা গেলো তারা B নামের একটা খাবারো পছন্দ করে।

এখন আপনি B খাবারটা নিয়ে গুগলে সার্চ করলেন। এর ফলে গুগল জানতে পারলো আপনি B খাবারটাতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন। সুতরাং আপনারো A প্লেলিষ্টের গান পছন্দ হওয়ার সম্ভাবনা অধিক। তখন আপনাকে A প্লেলিস্টের কিছু গান সাজেস্ট করা হবে। এমন সাধারণ ঘটনা আমাদের সাথে অনেক ঘটে। কারণ আপনি যখন ফেসবুকে স্ক্রল করা শুরু করেন। তখন দেখবেন কেন জানি আপনার প্রিয় জিনিসগুলাই দেখাচ্ছে। যেন মনে হচ্ছে, আপনার মন যা চাইছে তাই যেন আপনার সামনে আসছে। এখন কথা হলো ফেসবুক আপনার মন কিভাবে জানলো?


আসলে ব্যাপারটা সেখানে না। ব্যাপারটা বরং উল্টা। আপনি যদি আপনার অনেকটুকু সময় সোসাল মিডিয়ায় ব্যায় করে থাকেন তবে আপনাকে ওরা কন্ট্রোল করছে। আপনার ইচ্ছায় কোন পোষ্ট আপনার সামনে আসে না। বরং ওরা যেই পোষ্ট ক্রমাগত আপনার ফিডে পাঠাচ্ছে সেগুলোই আপনার ভালো লাগতে আরাম্ব করছে। মানে আপনার ভালো বা খারাপের উপরে ওরা কাজ করে না। বরং ওরাও আপনার ভালোমন্দ অনেকটাই নিয়ন্ত্রন করতে পারে। তাই বলা যায়, আপনি কেমন ড্রেস পড়বেন, কেমন হেয়ারকাট দিবেন সেগুলো এখন আর আপনি নির্ধারণ করেন না। সোসাল মিডিয়াই নির্ধারণ করে দেয়। যার ফলে বাংলাদেশের অনেক ছোট ছোট সংস্কৃতি এখন হুমকির মুখে। সেখানে সেই স্থান পশ্চিমা সংস্কৃতি দখল করছে। এগুলো আমরা নিজেরা ইচ্ছা করে করছি না। আমাদের উপরে জোর করে এই সংস্কৃতি চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এতে ক্ষতি কি হচ্ছে?


এর প্রভাবে যেমন বাংলাদেশের সংস্কৃতির ক্ষতি হচ্ছে ঠিক তেমনি আমাদের উপরে পশ্চিমাদের কর্তৃত্ব বাড়ছে। আমরা এখন তাদের কোন প্রোডাক্ট ছাড়া চলতেই পারি না। যদিও এখানে আমি ব্যাক্তিগত বিষয়েই বলছি। তবে সামগ্রিক দিক দিয়ে বিবেচনা করলে দেখা যাবে পুরোটাই রাজনৈতিক। সেই বিষয়ে আর এখন না বলাই ভালো।


কিন্তু মনে রাখবেন আপনাকেই ওরা পন্য বানাচ্ছে। যদি মনে করে থাকেন যে, এতে তো আমার কোন ক্ষতি হচ্ছে না আমি ভালোই আছি, তবে আপনি বোকার সর্গে বসবাস করছেন। ওরা যে আপনার মুল্যবান সময়গুলো ওদের দখলে নিয়ে নিচ্ছে তা আপনি টেরও পাচ্ছেন না। বলা যায়, আপনি সোসাল মিডিয়ায় আসক্ত হতে চান নি। আপনাকে করতে বাধ্য করা হয়েছে। আপনি যত কন্টেন্ট দেখবেন। আপনার সম্পর্কে ওদের ইনফরমেশনও তর কালেক্ট হবে। সেই হিসেবে ওরা আরো আপনার শখমতো কন্টেন্ট সাজেস্ট বা বিজ্ঞাপন সাজেস্ট করবে।


এখন আমাদের এই ব্যাক্তিগত ডেটাগুলো কেবল সেই নির্দিষ্ট সোসাল মিডিয়ার কাছেই আমানত থাকে না। এই ইনফরমেশনগুলোও চড়া দামে বিক্রি করা যায়। এই যেমন আমি আমার নিজের ঘটনা বলি। আমি ক্রোম ব্রাউজার দিয়ে একটা সিরিজ ডাউনলোড করেছিলাম। ক্রোম যেহেতু গুগলের একটা ব্রাউজার, তাই ওরা আমাদের বুকমার্ক, ক্রোম ব্রাউজিং হিস্ট্রি, অটো ফিলাপ ইত্যাদি ডেটা জমা রাখবে। সেটাই স্বাভাবিক।

এর কিছুদিন পড়ে ফেসবুকে আমি খেয়াল করলাম আমার রিলস ফিডে সেই সিরিজটির বিষয়ে নানা ভিডিও সাজেস্ট করা হচ্ছে। আমার প্রশ্ন হলো, আমি সিরিজ ডাউনলোড করলাম ক্রোম ব্রাউজারে। তো সেটা ফেসবুক কিভাবে জানলো?

আমার নিশ্চিত মনে হলো গুগল আমার ডেটা ফেসবুকের সাথে শেয়ার করছে। কোন কম্পানি এমনি এমনি কারো ডেটা কেন শেয়ার করবে? অবশ্যই এখানে অর্থের লেনদেন হয়েছে।


তবে যারা ডেটা বিক্রি করে না তাদের আয়ের উৎস হলো বিজ্ঞাপন নির্ভর। তারা তাদের ওয়েবসাইটে নানান পণ্যের বিজ্ঞাপণ দেখায়। বিনিময়ে বিজ্ঞাপনদাতার কাছ থেকে টাকা নেয়। কিন্তু ওয়েবসাইটের নির্মাতারা কাকে কাকে এই বিজ্ঞাপণগুলো দেখাবে? কাদের কোন কোন পন্য পছন্দ হয়, কার কোন কোন জিনিসে আগ্রহ। এসব বিষয় বিবেচনা করেই ইউজারদের কাছে বিজ্ঞাপণ পাঠানো হয়। ধরুন একদল "টাক মাথাওয়ালা" লোকদের যদি আমি চুলের শ্যাম্পু সাজেস্ট করি। তবে এই বিজ্ঞাপণটা পুরোই ব্যার্থ। এর জন্য দরকার এমন সব ইউজার, যাদের মাথায় চুল আছে এবং চুল নিয়ে যারা ফেসবুকে বা গুগলে নানান জিনিস দেখে। গুগলের কাছে কে কে চুলের যত্ন বিষয়ে সার্চ করে। এসব ডেটা জমা রয়েছে। গুগল টাকার বিনিময়ে এসব ইউজারদের IP ঠিকানা বিক্রি করে দিবে। তারপর সেই ওয়েবসাইটে তাদেরকেই সেই শ্যাম্পুর বিজ্ঞাপণ দেখানো হবে।


এখন বিনিময়ে আমি আপনিও সুবিধা পাচ্ছি। এসব সোসাল মিডিয়া আমরা বিনামুল্যেই ব্যাবহার করতে পারছি। বিজ্ঞাপণ বা ডেটা সংগ্রহ না করলে এসব সোসাল মিডিয়া টাকা দিয়ে কিনে ব্যাবহার করা লাগতো। যেহেতু ওরা ডেটা নির্ভর বানিজ্য করছে। তাই ওদের দরকার প্রচুর ইউজার। আর ওরা ইউজার ধরে রাখার জন্য নানান মজাদার কন্টেন্ট দেখাবে। যাতে আমরা তা সেসব সাইট ব্যাবহার করি।

কিন্তু অতিরিক্ত ব্যাবহার করতে গিয়ে যদি নিজের প্রাত্যাহিক কাজ নষ্ট করে ফেলি তবে এটা অবশ্যই একটা ক্ষতির কারণ।


#Abdul Awal

Comments

Popular Posts