কন্টেন্টের উপরে AI এর প্রভাব
এআই আসার পর কন্টেন্টেন্টের প্রতি আমাদের মায়া কমে যাচ্ছে। কেন এই কথাটা বললাম। আপনারা যারা ২০ শতকের মানুষ আছেন তারা একটা জিনিস খেয়াল করেছেন, তখন কন্টেন্টের পরিমান কম ছিলো। একটা সিনেমা বার বারই দেখা হতো। সিনেমার দৃশ্যগুলো আমাদের হাসাতো, কাঁদাতো। সিনেমার ইমোশনাল মুডে কেউ আর নিজের চোখের পানি ধরে রাখতো না। প্রতি সপ্তাহে BTV তে, একটা করে সিনেমা হতো। সেই সিনেমা দেখার জন্য সবাই অধীর আগ্রহে বসে থাকতো। যেদিন সিনেমা হতো, টিভির সামনে ঘড় ভর্তি মানুষ জমে যেতো। এলাকার সবার বাড়িতে টিভি কেনা সম্ভব হতো না। যার কারণে প্রতিটা টিভিওয়ালা বাড়িই তখন হয়ে যেতো সিনেমা হল। যেখানে সিনেমার নায়ক কষ্ট পেলে বা ভিলেনের কাছে পরাজিত হলে দর্শকরা কান্না করতো। চোখ দিয়ে তর তর করে পানি পড়তো।
একুশ শতকের ছেলেমেয়েদের জন্যও এটা প্রযোজ্য যে, আমরা ছোটবেলায় কার্টুন নেটওয়ার্ক চ্যনেল, বেন টেন, অগি, ছোটা ভিম, টম এন্ড জেরি এসবের সাথে পরিচিত ছিলাম। এসবের সাথে আরো যুক্ত ছিলো, সনি আটের আহট। দেখে দারুন আনন্দ লাগতো। নিজেদের টেলিভিশন ছিলো না। অন্য বাসার টিভিতে দেখতাম। রাতে সেগুলো ভয়ে দেখতে পারলাম না। অনেক ভয়ও পেতাম সেগুলো দেখে।
এখন সবার হাতেই মোবাইল, ইউটিউব। সবাই ইচ্ছামতো মুভি দেখতে পারে। রিলস, ভিডিও, এন্টারটেইনমেন্ট-এর ভিডিও ভুরিভুরি। কোনটা রেখে কোনটা দেখবো। একটা সিনেমা একবারের বেশি দেখাই হয় না এখন আর। এসব দেখে এখন আর অতোটাও আবেগ কাজ করে না। এখন আর কষ্টের সিন দেখে কান্না করি না। কারণ এমন ভিডিও ইউটিউবে অনেক। কান্না আর আসে না। মজার কোন কিছু দেখলেও আগের মতো হাঁসি পায় না। এখন কোথাও টেলিভিশন চললে লোক ভিড় হয় না। সবার হাতেই টেলিভিশন।
NETFLIX এর প্রতি আসক্ত হওয়ার অনেকদিন পর আলিফ লায়লা, সিনবাদ, আহট এর গ্রাফিক্সগুলা হাস্যকর মনে হয়। এখন আর আহট দেখে ভয় পাই না। বরং হাসি পায়। এতো বাজে অভিনয় আর এডিটিং। অথচ আগে এসব দেখেই ভয়ে আংগুল দিয়ে চোখ লুকাতাম।
কন্টেন্ট বাড়ছে। আগে ক্যামেরা সহজলভ্য ছিলো না। অনেক পরিশ্রম করে একটা সিনেমা বানানো হতো। কিন্তু এখন ক্যামেরা সহজলভ্য হয়েছে। এডিটিং সহজ হয়েছে। যে কেউ কন্টেন্ট বানাতে পারে। বানাচ্ছেও। কোনটা ছেড়ে কোনটা দেখবেন? ধরুন কন্টেন্টের সাগরে আপনি সাঁতার কাঁটছেন। কোনটা ভালো কোনটা খারাপ? এসব জিনিস দেখলেও এখন আর সেগুলা আমাদের মনের উপরে প্রভাব ফেলতে পারবে না। ভিডিও কন্টেন্ট দেখতে দেখতে আমরা এখন বিরক্ত। তবুও আমরা রিলসের মধ্যে কি যেন একটা খুঁজি। আমরা সেটা খুঁজে পাই না। সারাক্ষন স্ক্রল করতে থাকি। যাদের চিন্তা করার ক্ষমতা আছে তারা ইতিমধ্যেই চিন্তা করে ফেলেছেন। আর যারা এই রিলসে আসক্ত হয়ে গেছেন তাদের এই চিন্তা করার ক্ষমতাই নেই। এমনকি তারা এতোটা সময় নষ্ট করে আমার এই লেখাটা পড়বেই না। এই বিশাল লেখাটা তাদের কাছে অর্থহীন মনে হবে। অথচ বর্তমানের রিলসের চেয়ে আমার এই লেখার প্রতিটা শব্দগুলো অনেক গুরুত্ত্বপুর্ণ। আসল কথা হলো তাদের ধৈর্য প্রচন্ডভাবে কমে গেছে। অল্প সময়েই তারা আনন্দ খুঁজে পায়। তাই কেউ আর কষ্ট করে আনন্দ পাওয়ার অপশনটি বেছেই নিবে না।
এখন সোসাল মিডিয়া খুললেই কন্টেন্ট। বিনোদনের কোন অভাব নেই এই বর্তমান পৃথিবীতে। কিন্তু অতিরিক্ত কোন কিছুই যে ভালো নয় এটা আমরা সবাই জানি। অতিরিক্ত বিনোদন পেতে পেতে আমাদের ব্রেনের জন্য সেটাই স্বাভাবিক হয়ে গেছে। তখন সে আরো এফেক্টিব জিনিসের আশা করে। তখন আগের সেই বিনোদনের মাধ্যমগুলা কাজ করে না। এই যেমন, আগের টিভি সিরিজগুলো দারুন মজা লাগতো। কিন্তু এখন আরো ভালো ভালো OTT আসার পর আগের সেই সেইম সিরিজগুলো আমাদের ভালো লাগছে না। এর কারণ হলো আমাদের ব্রেণগুলো এখন উন্নত গ্রাফিক্স দেখে অভ্যস্ত হয়ে গেছে। এখন আগের সেই পুরো ধাচের জিনিসগুলা ভাল্লাগে না।
ইউটিউব খুললেই ভিডিও। মজাদার কন্টেন্টে ভরা টাইমলাইন। কোনটি দেখবেন? মোবাইলে যে অনেক্ষনযাবৎ স্ক্রল করছেন? নিচের দিকে কী খুঁজছেন? কিছু একটা তো অবশ্যই খুঁজে যাচ্ছেন। এমনকি আপনি নিজেও যানেন সেই জিনিসটা আপনি কখনো পাবেন না, তবুও আপনি স্ক্রল করে নিচের দিকে যাচ্ছেনই। বিনিময়ে কি পাচ্ছেন? কিছুই তো পাচ্ছেন না। মন ভালো তো মোটেও হচ্ছে না। ঘন্টার পর ঘন্টা স্ক্রল করতে করতে নিজের চোখে ক্লান্তি নেমে আসতে চায়। তাও মন শান্ত হচ্ছে না। আপনার সিদ্ধান্ত নেওয়ার শক্তি কমে আসছে দিন দিন সেটা আপনি বুঝতেও পারছেন না।
আমার নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, যারা দাবা খেলতে জানেন, তারা ১ ঘন্টা রিলস দেখার পর খেলতে বসবেন। আপনি খেয়াল করে দেখবেন, আপনি প্রচুর ভুল সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। আপনার চালগুলো সঠিক হবে না।
থাক। সেই ব্যাপার নিয়ে পরে হয়তো আলোচনা করার সময় পাওয়া যাবে। কিন্তু এখন আমাদের আলোচনার টপিক আলাদা। Ai আসার পরে খুব সহজেই ChatGPT দিয়ে ১ মিনিটেই স্ক্রিপ্ট লিখে Veo দিয়ে খুব সহজেই ভিডিও বানানো যায়। আপনার আমার মতো সকল মানুষই তখন চাইবে নিজেই ভিডিও তৈরি করে Youtube এ আপলোড করে একটা ইনকাম সোর্স তৈরি করা। আপনার আমার মতো সবাই যদি এই সিদ্ধান্ত নেয় প্রথমত youtube-এ আর কোন মানসম্পন্ন প্রাকৃতিক কন্টেন্ট পাওয়া যাবে না। সেই কন্টেন্টের প্রতি কোন আবেগ থাকবে না। কারণ, সোসাল মিডিয়াতে আমরা একটা নির্দিষ্ট পরিমানে আবেগ দ্বারা আক্রান্ত হই। এর বেশি আবেগপ্রবন হয়ে গেলে সেই আবেগটাই মানসিক চাপ হয়ে দাঁড়ায়। এর ফলে যেই সমস্যাটা হবে সেটা হলো, মানুষটা সেই সোসাল মিডিয়ার কন্টেন্টের বেড়াজাল থেকে বের তো হতে পারবেই না। বরং সোসাল মিডিয়া ব্যাবহার করেও সে ডিপ্রেসড হতে থাকবে। কোন জিনিস করতে তখন আর ভাল্লাগবে না। কাজের উপর আলসেমি চলে আসবে। এমনকি এটাই আমাদের বর্তমান জেনারেশনের হচ্ছে। আমরা নিজেরাই জানি যে রিলস দেখে সেরকম আহামরি কোন লাভ হবে না। তবুও আমরা রিলস দেখছি। আগে প্রথম প্রথম স্ক্রলিংয়ে যে আনন্দটা ছিলো সেটা নিশ্চিত এখন আর নেই। তবুও আমরা ঘন্টার পর ঘন্টা ক্রলিং করেই যাচ্ছি। স্ক্রলিং করা বাদও দিতে পারছি না। এর ফলাফল?
এর ফলাফল পড়তে বসলেই অল্প সময়ে বিরক্ত হয়ে যাওয়া। ১০ মিনিট পড়ার পড়েই আমাদের মন বলবে, একটু ফেসবুকে ঢুকি। ফেসবুক চালাতে গিয়ে কখন যে নিজের অজান্তেই রিলস দেখা শুরু করেছেন সেটা নিজেরই খেয়াল নেই। ঘন্টার পর ঘন্টা চলে যায় রিলস দেখতে। বাট পড়তে বসলে সময় কাঁটে না। একটু পড়তে বসলেই নানান চিন্তা মাথায় এসে জড় হয়। অকারণে হাই আসে। কারণ আপনি রিলস দেখে অভ্যস্ত। পড়াশুনার মতো পরিশ্রমের কাজ আমাদের ব্রেণ করতে চায় না। আর আমাদের ব্রেণের কোডিং এমনভাবে করা হয়েছে যে ব্রেণ সবসময় নতুন কিছু খুঁজতে থাকে। পুড়নো জিনিস সে পছন্দ করে না। একবার নতুন জিনিস পেয়ে গেলে সহজেই পুড়নো জিনিস আর ভালো লাগবে না। বর্তমান মুভি সিরিজের ক্ষেত্রেও এটা দেখা যায়।
এর প্রভাব আমাদের জীবনে কতটুকু পড়বে সেটা আগেই বলা যাচ্ছে না। প্রযুক্তির সাথে আপডেট রাখা মানে এই নয় যে সারাক্ষন ফেসবুক, টিকটর স্ক্রলিং করে সময় অপচয় করা। যদি বর্তমান পৃথিবীর সাথে খাপ খাওয়াতে চান তবে নিজের মেধা খাটাতে হবে। প্রচুর স্টাডি এবং গবেষণা করতে হবে। বই পড়তে হবে। প্রযুক্তি ব্যাবহারের নামে যদি আপনি প্রযুক্তিতে আসক্তি হয়ে যান তবে ব্যাপারটা এমন হয়ে যায় যে আ্যলকোহল নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে আপনি মদে আসক্ত হয়ে গেলেন।
লেখাঃ মোহাম্মদ আব্দুল আউয়াল
Tag: ai এর সুবিধা অসুবিধা, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স এর সুবিধা, ai এর অসুবিধা, এ আই এর অপব্যাবহার, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কি



Comments
Post a Comment