সেদিন রাত্রি এসেছিলো

 পর্ব ০১


আরুর সাথে প্রচন্ড ঝগড়া করেছি সেদিন। কী বিষয়ে ঝগড়া হয়েছে তা বলার মুড এখন নেই। প্রচন্ড মাথা ধরে গেছে আমার। কিছুক্ষন আগে দুজন ডিভোর্স পেপারে সাইন করলাম। আমি আর আরু আলাদা হয়ে যাবো আজ থেকে। যদিও ওকে ভালোবেসেই বিয়ে করেছিলাম। কিন্তু কেন জানি আমার ভালোবাসাটা টিকলো না। আরুকে যে একা দোষ দিবো তাও নয়। নিজেও অপরাধী। নিজের অপরাধ আর সবাইকে বলে লাভ কী? সেটা নাহয় আমার নিজের মনের ভিতরেই থাকুক।


কিছুই ভালো লাগছে না কেন জানি। আজ থেকে সাত বছর আগে আমি বাবার সাথে রাগ করে গ্রাম ছেড়ে শহরে চলে আসি। তারপর আর বাবার খোঁজখবরও নেওয়ার চেষ্টা করি নি। বেঁচে আছি কিনা মরে গেছে, তাও জানি না। এই সাতটা বছর আমি গ্রাম থেকে পুরো বিচ্ছিন্ন। আরুর সাথে ঝগড়া করার পর কেন জানি আজকে গ্রামের কথাটা বড্ড মনে পড়লো হঠাৎ করে।

আরু বলেছে, সে অন্য একটা ছেলেকে ভালোবাসে। আমি নাকি তার ভালোবাসার যোগ্য নই। কথাটা আমার কানে বার বার প্রতিধ্বনিত হতে লাগলো। আমি কী এতোই অযোগ্য। এতো ভালোবেসে যাকে বিয়ে করলাম, কোনো কিছুর অভাব যাকে বুঝতে দেই নি। সে আমার চোখের সামনে বলে দিলো, "তুমি আমার ভালোবাসার যোগ্য নও।" কথাটা যে আমাকে কতোটা আঘাত দিয়েছে সেটা পরিমাপ করার মতো যন্ত্র এখনো আবিষ্কার হয় নি।


পরদিন চাকরিটা ছেড়ে দিলাম। বস অনেকবার শান্তনা দিলো। বার বার বুঝালো, একটা খারাপ মেয়ের পাল্লায় পড়েছেন, তার জন্য নিজের লাইফ এবং আমাদের কম্পানি দুটাকেই বিপদে ফালাবেন না। আপনার মতো সৎ এবং ট্যালেন্টেড মানুষ আর একটাও পাবো না। কিন্তু বসের কথাগুলো এক কান দিয়ে ঢুকিয়ে আরেক কান দিয়ে বের করে দিলাম। বললাম, আমি আর চাকরিটা করবো না। আমার আর ইচ্ছা নেই। জোর করে তো কাউকে দিয়ে কোন কাজ করানো যায় না। জোর করে যদি সবই করা যেতো, তাহলে আরুর উপরেও জোর করে অনেক কিছুই করতে পারতাম। কিন্তু করি নি। শেষমেশ মুক্ত করে দিয়েছি। এবার আপনিও আমাকে মুক্ত করে দিন প্লিজ।


শেষমেশ বাসাটাও ছেড়ে দিলাম। ভাবলাম তারপর গ্রামে গিয়ে সেখানে একটা ব্যবসা শুরু করবো। আচ্ছা। বাবা কী আমাকে দেখে খুশি হবেন? মনে মনে ভাবলাম, এতো রাগ করে থেকে লাভ কী? তার চেয়ে মনের সমস্ত রাগ অভিমান মুছে ফেলা যায় না? ভাবলাম বাবার কাছে নাহয় ক্ষমাই চাইলাম। বাবা নিশ্চই ক্ষমা করে দিবেন।

বাসার সমস্ত জিনিসপত্র বিক্রি করে দিলাম। আজকে দুপুরেই বাসে উঠে গ্রামের উদ্দেশ্যে রওনা হবো। সারাদিন অনেক ধকল গেল। দুপুরে একটা হোটেলে খেয়ে বাসে উঠে পড়লাম। হাতে একটা ব্যাগ। ব্যাগে আহামরি কিছুই নেই। নিজের কয়েকটা জামাকাপড়। আর কিছু টাকাপয়সা। ঢাকা থেকে পুরোটা বিচ্ছিন্ন হয়ে চলে আসলাম। এই সাত বছরে ঢাকায় আমার অনেক পরিচিত মানুষ বানিয়েছিলাম। একে একে সবাইকে বিদায় জানানো সম্ভব না। তাই কাউকেই বিদায় জানাই নি। সবাইকে না জানিয়েই চলে এসেছি। আরুকেও একবার বলার চেষ্টা করি নি। আর বলেও যে আহামরি অনেক লাভ হবে তেমনটাও না।


বিকেল হতে যাচ্ছে। আস্তে আস্তে ঠান্ডা লাগতে আরাম্ব করলো। যদিও এখন বর্ষাকাল কিন্তু বাসের ঠান্ডা বাতাসে মনে হচ্ছে শীতকাল। ব্যাগ থেকে একটা মোটা কাপড় বের করে সেটা পরে নিলাম। দুই পাশে ধানের জমি। মাঝখান দিয়ে রাস্তা। শহর থেকে অনেক দূরে চলে এসেছে বাসটা। পশ্চিম আকাশে সুর্যটা টকটকে লাল হয়ে আছে। সুর্যের আলো মুখে এসে লাগে। মৃদু আলো আসাতে চোখের উপরে তেমন চাপ পড়ে না। বাবার কথা খুব বড্ড মনে পড়ছে। ছোটবেলায় বাবার সাথে মাঝে মাঝে ক্ষেতে যাওয়া হত। তখন সবশেষে এমন সুর্য দেখেছে সে। শহরেও এমন সুর্য আর দেখা যায় না। বড় বড় সব অট্টালিকায় সকাল এবং বিকেলের সুর্যটা ঢাকা পড়ে যায়।


আমার সামনের সিটে একটা ছেলে এবং আরেকটা মেয়ে বসে অনেক্ষনযাবৎ গল্প করে যাচ্ছে। কথাগুলো শোনা যাচ্ছে না। মনে হয় নতুন বিয়ে করেছে। নতুন বিয়ে হলে তখন আলাদা একটা অনুভূতি কাজ করে। প্রথম প্রথম সবকিছুই ভালো লাগতে শুরু করে। আমিও যখন আরুকে প্রথম ভালোবেসে বিয়ে করেছিলাম। ওদের মতোই এমন করে নানান গল্প হতো। কী থেকে কী হয়ে গেল চোখের সামনে কিছুই বোঝা গেল না। মেয়েটার চুলের ঘ্রাণটা আমার নাকে আসছে। আচ্ছা। প্রতিটা মেয়ের চুলের ঘ্রাণ কি একই রকম হয়? যেদিন প্রথম আরুর চুলের গন্ধ আমার নাকে এসেছিলো সেদিনও আমার একটা মেয়ের কথা মনে পড়ে গিয়েছিলো। আজকেও মেয়েটার কথা মনে পড়ছে। ভাবলাম, এভাবে সেদিন ওকে ফেলে রেখে শহরে না আসলেও চলতো।


মেয়েটার নাম ছিলো রাত্রি। রাত্রির বাবা-মা দুজনেই সড়ক দুর্ঘটনায়া মারা গিয়েছিলো। রাত্রির বাবা-মা বাসা থেকে নাকি পালিয়ে বিয়ে করেছিলো। সেটাই রাত্রির জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়। কোন পক্ষই রাত্রিকে নিতে চাইলো না। তাই একসময় রাত্রির বাবার বন্ধু আমার কাকা রাত্রিকে কোলে তুলে নিলো। সেদিন অন্ধকার রাতে একজন অপরিচিত লোক আমার কাকার হাতে বাচ্চা মেয়েটার দায়িত্ব দিয়েছিলো। রাতের সেই ঝিঝি পোকার শব্দ শুনে সেদিন মেয়েটার নাম রাখা হলো "রাত্রি"। তখনো কাকা বিয়ে করে নি। কথাগুলো আমার বাবার মুখ থেকে শুনেছিলাম।


একসময় আমার কাকাও বিয়ে করে ফেলল। রাত্রি এইবার জীবনে প্রথম কোন নারীকে মা বলে ডাকতে পারবে। রাত্রির বয়স তখন সবে মাত্র তিন। আমার বয়স তখন কত হবে? পাঁচ নাহয় ছয়। সবেমাত্র স্কুলে ভর্তি হয়েছি। লেখাপড়ার যাত্রা শুরু। আমার সাথে তখনো ওর অতোটা ভালো পরিচয় হয়ে উঠে নি। সারাক্ষন পাড়ার ছেলেদের সাথেই খেলাধুলা করতাম। কিন্তু আমার বাড়ির পাশেই যে একটা প্রাণ বেড়ে উঠছে সেটি নিয়ে কখনো ভাবী নি। আমিও আস্তে আস্তে বড় হতে লাগলাম। একদিন আমার মা-ও আমাকে ছেড়ে চলে গেল। মা মারা যাওয়ার আগে নিজে কখনো একাকিত্ব অনুভব করি নি। মা মারা যাওয়ার পরেই প্রথম "একাকিত্বের" সাথে পরিচয় হলাম। কোন কিছুই ভালো লাগতো না। আমার বাবা আর কাকা দুজন গ্রামে ব্যাবসা করতো। তখন থেকেই ভালোবাসার ছায়াটা আস্তে আস্তে সরে যেতে লাগলো আমার মাথার উপর থেকে। সকালে আর রাতে ছাড়া বাবার দেখা পেতাম না। সম্পুর্ণ একা হয়ে গেলাম আমি। এই একাকিত্বই আস্তে আস্তে আমাকে খারাপের দিকে ঠেলে দেয়। স্কুলে খারাপ বন্ধুদের পাল্লায় পড়লাম। লেখাপড়ার অবস্থা ভয়াবহ আকার ধারণ করলো। শাষন করার মতো কেউ ছিলো না। আমার বাবাও কেন জানি আর বিয়ে করলো না। বাবা হয়তো জানতো নতুন মা আমাকে আগের মতোন যত্ন করতে পারবে না। এই ব্যাপারটাও ঠিক রাত্রির সাথেও হয়তো ঘটেছিলো। কাকা বিয়ে করার কিছুদিন পরেই তার আরেকটা মেয়ের জন্ম হয়। তার পর থেকেই রাত্রি জীবনে আরেকটা নতুন অধ্যায় শুরু হয়। রাত্রির জীবন থেকে আবার মায়ের ছায়া হাড়াতে থাকে। তখন রাত্রি অনুভব করতে পারে এটা তার সৎ মা।


বিকেলে স্কুল থেকে একা বাসায় ফিরতাম। বাবা অনেক রাতে বাড়িতে আসতো। তাই বিকেলে মাঝে মাঝে বন্ধুদের সাথে ক্রিকেট খেলতাম। সন্ধ্যায় বাসার ফিরতাম। এভাবেই চলছিলো আমার স্কুল জীবন। যখন আমি ক্লাশ এইটে উঠলাম তখন রাত্রির সাথে আমার নতুন করে পরিচয় হলো। রাত্রি তখন সবে স্কুল পরিবর্তন করে ক্লাশ সিক্সে উঠলো। গ্রামের স্কুল ছিলো। যাতায়াতে সুবিধা ছিলো না মোটেও। কাকিমা বলে দিলো, তুই আর রাত্রি একসাথে স্কুল থেকে ফিরবি। ও নাকি একা ভয় পায়। কাকিমাকে বার বার বুঝানোর চেষ্টা করলাম বিকেলে আমি বন্ধুদের সাথে খেলতে যাই। আসতে সন্ধ্যা হয়ে যায়। কিন্তু কে শোনে কার কথা। রাত্রিকে প্রতিদিন স্কুল থেকে আনতে হবে ব্যাস। প্রথম প্রথম আমার মাথায় যেন আগুন জ্বলছিলো। যাই হয়ে যাক আমার দ্বারা এসব হবে না।


পরদিন স্কুল যথাসময়ে ছুটি হলো। চিন্তা করলাম যত দ্রুত সম্ভব এখান থেকে পালিয়ে মাঠে যেতে পারলেই হলো, বেচারি আমাকে খুঁজে না পেয়ে শেষমেশ একাই চলে যাবেনি। ক্লাশ শেষ হলে হন হন করে মাঠের দিকে রওনা দিলাম। আজকে আমাদের ব্যাচের সাথে নবম শ্রেনীর ফাইনাল ক্রিকেট ম্যাচ। এই খেলা মিস করার প্রশ্নই আসে না। একবার ভাবলাম, মেয়েটাকে বলে দিলেই হতো "আমার জন্য অপেক্ষা করিস না। নিজে যাওয়ার সাহস বানাবি।" তাই ওর জন্য প্রথমে কিছুটা খারাপ লাগলো। এতোক্ষনে চলে গেছে হয়তো। একা একা একটা বাচ্চা মেয়ে। নাহ্। ওভাবে ছেড়ে দেওয়াটাও ঠিক হলো না।

সব ভুলে খেলায় মনোযোগ দিলাম। আজকে যেভাবেই হোক নিজেদের দলকে জেতাতে হবে। খেলতে খেলতে একসময় মেয়েটার কথা ভুলেই গেলাম। আমাদের ব্যাচের মধ্যে মনে হয় আমিই সবচেয়ে দুর্বল খেলি। আমার ব্যাটিং করার ভালো অভ্যাস নেই। কিন্তু প্রচন্ড অনুপ্রেরণায় আমাদের টিমটাই জিতলো। তারপর পুরস্কার বিতরন চললো অনেক্ষনযাবৎ। সন্ধ্যা হয়ে আসছে। ক্লান্ত শরির নিয়ে নিজের ব্যাগটা কাঁধে নিতেই পিছন থেকে আমার শার্ট টেনে ধরলো কেউ একজন। আমি পেছনে তাকিয়ে তব্দা খেয়ে গেলাম। রাত্রি এখনো বাসায় যায় নি। আমি ধমক দিয়ে বললাম, এখনো বাসায় যাস নি কেন? রাত্রি শান্ত গলায় বলল, একা যেতে পারবো না ভাইয়া। আমার অনেক ভয় লাগে।

: ধুর। ভীতু কোথাকার। একা যাওয়া শিখতে হবে না? এখনো তুই বাসায় না গিয়ে আমার জন্য অপেক্ষা করছিস। কাকিমা চিন্তা করছে না?

: হুম। বাড়িতে গেলে খুব মারবে আমাকে।

: মারবে নাতো চুমু খাবে নাকি? স্কুল ছুটি হয়েছে বিকেলে। আর এদিকে বেলা ডুবে গেছে কখন।

: তোমারই তো দোষ। আমি একা যেতে পারবো না। আমার অনেক ভয় লাগে।

: হয়েছে এইবার। চল।


দুজনে একা একা পথ দিয়ে হাঁটছি। ফেব্রুয়ারি মাস। প্রচন্ড শীতের সময়। তবে আমার মোটেও শীত লাগছে না। বাসায় গিয়ে ঠান্ডা পানি দিয়ে গোছল করতেও আমার এইসময় বড্ড ভাল্লাগে। কিন্তু রাত্রি শীতে কাঁপছে। আমি বললাম, এভাবে কাঁপছিস কেন?

: অনেক ভয় করে আমার।

: কিসের ভয়?

: যদি একটা ভূত এসে সামনে পড়ে?

: ভূত দেখেছিস আগে?

: হুম। অনেকবার।

: সর। ওগুলা সব মিথ্যে কথা। ভূত বলে কিছু হয় না। এগুলা শুধু তুই নিজে কল্পনা করে ভয় পাস।

জীবনে প্রথম রাত্রি আমার হাত ধরল। আমিও শক্ত করে ওর হাতটা চেপে ধরলাম। আমি বললাম, এখন থেকে ভয় পাওয়া চলবে না। তুই তো অনেক ভাগ্যবতী মেয়ে। তোর বাবা-মা মরে গেল। তবুও তুই দিব্বি বেঁচে গেলি।


রাত্রির সাথে সেদিনই আমার ভালোভাবে কথা হয়। এর আগে আমি আর ও হয়তো ভিন্ন একটা জগতে ছিলাম। তারপর থেকে আমাদের সুন্দর একটা সম্পর্ক হয়। সেদিনের পর থেকে আর বিকেলে খেলতে যাই না। কাকিমার কথাই রইলো। দুজনে একসাথেই স্কুল থেকে ফিরতাম।


: তোর নতুন মা তোর সাথে কেমন ব্যাবহার করে? অনেক আদর করে?

: ভালোই আদর করে।

: মারে না?

: নাহ্।

: তাহলে তো অনেক ভালো। জানিস। আমার মা-ও আমাকে অনেক আদর করতো। কিন্তু আল্লাহ্ কেন যে আমার মাকে নিয়ে গেলো। একটা জিনিস জানিস?

: কি ভাইয়া?

: আমার মনে হয়, আমরা যেই জিনিসটা বেশি যত্ন করি। সেই জিনিসটাই খুব তারাতারি হাড়িয়ে যায়।

: সত্যি? কিন্তু কেন?

: জানিনা, কেন এমনটা হয়।


আমরা আস্তে আস্তে আরো বড় হতে লাগলাম। আমি দশম শ্রেনীতে উঠলে রাত্রি অষ্টম শ্রেনীতে উঠে গেল। আমার চোখের সামনেই মেয়েটা কেমন যেন বড় হয়ে গেল। আমি এখনো স্কুল শেষে ওর জন্য অপেক্ষা করি। ছুটি হলে দুজন একসাথে বাসায় যাই। রাত্রিকে এই প্রথম দেখে মনে হলো, বড্ড সুন্দর চেহাড়ার অধিকারিণী হয়েছে ও। এই কিছুদিন আগেও যাকে দেখতে ছেলেদের মতো লাগতো, এখন মাঝে মাঝে নিজেই তাকিয়ে লজ্জা পাই। ওর স্বভাবের মধ্যে অনেক পরিবর্তন আসতে লাগলো। আগে যেমন ঘণ ঘণ আমার হাত ধরতো। এখন রাত্রি আমার হাত ধরে না। আমার পিছন পিছন আসে। কথাবার্তার পরিমান কমতে লাগলো।

হঠাৎ করে একদিন শুনলাম রাত্রির জন্য বিয়ের সম্বোন্ধ এসেছিলো। ওর কি তাহলে বিয়ের বয়স হয়ে গেছে? গ্রামে এই বয়সেও মেয়েদের অনেক ভালো পাত্রের সাথে বিয়ের সম্বোন্ধ আসে।


: শুনলাম তোর নাকি বিয়ে ঠিক হয়েছে?

আমার কথার উত্তরে রাত্রি মাথা নিচু করে "হ্যাঁ" বলল।

: জামাই দেখতে কেমন রে?

: ভালোই।

: তোর তাহলে পছন্দ হয়েছে?

রাত্রি আমার কথার কোন উত্তর দিলো না। আমি আবার বললাম, বিয়ের পরে তো আর আমার সাথে স্কুলে আসতে পারবি না। তোকে অনেক মিস করবো।

: তুমি চাও আমি বিয়ে করে চলে যাই?

: চাই না। তাই বলে বিয়ে করতে হবে না? প্রতিটা মেয়েকেই বিয়ে করে দূরে চলে যেতে হয়।


আশেপাশে কোন মানুষজন নেই এদিকটায়। হঠাৎ পেছন থেকে রাত্রি আমার হাত ধরে আমার হাঁটা থামিয়ে দিলো। আমি রাত্রির হাতের দিকে তাকিয়ে রইলাম। শক্ত করে ধরেছে। এই ধরার ভিতরে অনেক ভাষা লুকিয়ে আছে সেটা বুঝার বয়স আমার ততদিনে হয়েছে। রাত্রি আমার দিকে তাকিয়ে বলল, ভাইয়া, তুমি যদি আমাকে বিয়ে করো তাহলে তো আমি দূরে যাচ্ছি না।

: কি বলছিস তুই রাত্রি? পাগল হয়ে গেলি নাকি?

: আমার কিছুই ভালো লাগছে না ভাইয়া। আমি ওই লোককে বিয়ে করবো না।

: তো সেটা আমার কাকাকে বল, যে লোকটাকে তোর পছন্দ হচ্ছে না।

: বাবা শুনবে না। বাবা শুধু আম্মার কথা শুনে। আম্মা চায় আমি এই বাড়ি থেকে চলে যাই।

: কেন? তুইই তো মাঝে মাঝে বলিস, তোকে অনেক ভালোবাসে তোর মা।

: জানো! আমাকে তুমি ছাড়া আর কেউ ভালোবাসে না। আমার বাবাও আমাকে দেখে কেমন জানি করে।

: কেমন করে রে?

: মা বকা দেয় বাবাকে। বলে, "এতো দরদ দেখিয়ে একটা ঝামেলা ঘরে আনলে কেন? এতো খরচ কিভাবে বইবে? নিজের একটা মেয়ে আছে সেদিকে দেখতে হবে না? সেও তো বড় হচ্ছে।" আচ্ছা। ভাইয়া আমি কি মানুষ না? আমার আপণ মা-বাবা নেই বলেই আমার সাথে এসব হচ্ছে?


কথাটা শোনার পর দেখলাম, রাত্রি পুরোপুরি কান্নায় ভেঙে পড়েছে। রাত্রির জন্য এই মুহুর্তে কিছু একটা করতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু কী করতে হবে তা আমার মাথায় আসলো না। একসময় রাত্রি বলল, তুমি একটু অংকেলকে বলবে প্লিজ। আমি তোমাকে ছেড়ে দূড়ে যাবো না।

: তুই যেহেতু মনে করছিস, তোকে কেউ ভালোবাসে না। তাহলে তুই সেই লোকটাকে বিয়ে করে তাদের বাড়িতেই চলে যা। সেখানে গেলে হয়তো তুই ভালো থাকতে পারবি।

: এটা ভাবতে পারলে তুমি? এতোক্ষন ধরে এই বুঝলে তাহলে? তুমি মনে করেছো আমি একা ভয় পাই বলে তোমার সাথে স্কুল থেকে ফিরি? থাকো তবে। আমি চললাম।


কথাটা বলে রাত্রি হন হন করে আমাকে ছেড়ে সামনের দিকে এগিয়ে গেল। আমি রাত্রির চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইলাম। একবার ডাকতে ইচ্ছে করলো আমার। কিন্তু ডাকার সাহস পেলাম না। মনে হচ্ছে, এতো ভালো সম্পর্কটা বিশাল ধাক্কায় নড়ে উঠলো।


সেদিন রাতে আমার মাথায় কোন কাজই করলো না। কি থেকে কি হয়ে গেল সব। পরদিন রাত্রিও আমার জন্য অপেক্ষা করলো না। আমাকে ছেড়েই স্কুল থেকে বাসায় চলে আসলো। হঠাৎ মনের ভিতরে কেমন যেন করে উঠলো। অন্যরকম একটা অনুভুতি। ভাবলাম আজকে রাতে বাবাকে এই বিষয়ে বলবো।

বাবার বাড়ি আসতে আসতে অনেক রাত হয়। খাওয়াদাওয়ার পর বাবা বিছানায় যান। তারপর ধীরে ধীরে আমি বাবার বিছানার কাছে গেলাম। বাবা আমাকে দেখেই বললেন, আনিস। পড়াশুনা কেমন চলছে?

: ভালোই।

: কিছু বলবি আনিস?

: ইয়ে মানে একটা কথা ছিলো।

: আয়। পাশে এসে বোস।

আমি বাবার পাশে গিয়ে বসলাম। বাবা আমার হাতের উপরে হাত রেখে বলল, কিছু লাগবে নাকি তোর?

: আমার কিছু লাগবে না।

: তাহলে বল। কি বলবি?

: শুনলাম রাত্রির নাকি বিয়ে ঠিক হয়েছে?

: হ্যাঁ। ভালো ছেলে। ব্যাবসা করে।

: তো ছেলে ভালো মানলাম। কিন্তু একবারো কি রাত্রির মতামত নেওয়ার দরকার হয় নি?

: মেয়ে কি আমার নাকি? তাদের মেয়ে তাদের ইচ্ছে, সেখানে আমার কি যায় আসে?

: অনেক কিছুই যায় আসে। তোমার ভাইয়ের মেয়ে। যদিও আপন রক্তের মেয়ে নয়, তাই বলে যাচ্ছেতাই করবে?

: তুই এতো মাথা ঘামাচ্ছিস কেন? রাত্রির যদি মত না থাকে তবে তার বাবাকে সে নিজেই বলবে।

: বাবা। তোমার কাছে সহজে কিছু চাই না আমি। আজকে একটা জিনিস চাইলে আমাকে দিবে?

: কি? যদি সাধ্য থাকে তবেই দিবো।

: তোমার নিজের তো কোন মেয়ে নেই। রাত্রিকে তোমার মেয়ে বানিয়ে আমাদের ঘরে আনো না প্লিজ।


বাবা আমার কথা শুনে অনেক্ষন চুপ করে রইলেন। তারপর অনেক ভাবনা চিন্তার পর বললেন, তুই এখনো অনেক ছোট। এখনো নিজের পায়ে দাঁড়াস নি। তুই অন্য একটা মেয়ের ভাড় কেমনে বইবি। তারপরও তোর আবদারটা ফেলে দেওয়ার মতো নয়। আমি কাল সকালে তোর কাকার সাথে কথা বলে দেখবো। তবে মনে হয় না কোন কাজ হবে। তুইই বল, এতো বড় লোকের ছেলে রেখে তোর মতো বেকার ছেলের হাতে মেয়েকে তুলে দিবে?

সেদিন রাতে চিন্তায় আমার ঘুম আসলো না। নিজেকে বার বার বুঝানোর চেষ্টা করলাম যে তাদের ফ্যামিলির বিষয় নিয়ে তারা চিন্তা করবে, এখানে আমার নিজের নাক গলানো উচিৎ হবে না।


পরদিন স্কুল বন্ধ। রাত্রি আর আমি যখন অনেক ছোট ছিলাম তখন দুজনে একসাথে অনেক খেলাধুলা করেছি। ওর কোন মেয়ে বন্ধু ছিলো না। ওর সাথে পুতুল খেলা হয়েছে। রাত্রি পুতুলের জন্য রান্না করতো। আমি সেই রান্নার জন্য বাজার করে দিতাম। অনেক সুন্দর একটা দিন গিয়েছে তখন। আমি মনে হয় অতোটা বড় হই নি। আমার চেহাড়া, শখ আহ্লাদ, ছেলেমানুষি ব্যাবহার কিছুই পালটে নি। কিন্তু আমি রাত্রির দিকে তাকিয়ে অবাক হই। মাঝে মাঝে মনে হয় এটাই কি সেই মেয়েটা?


শনিবার বিকেলে স্কুলে যাওয়ার পর দেখি রাত্রি স্কুলে আসে নি। রাত্রি তো সহজে স্কুল মিস দেয় না। আমার মনে হলো সেদিনের পর থেকে ওর ব্যাবহার পুরো পালটে গেছে। ছুটির পর একবার ওদের বাড়িতে গিয়ে দেখতে হবে।

স্কুল ছুটি হয় চারটায়। বাসায় আসতে আসতে পাঁচটা বেজে গেছে। চারদিকে অন্ধকার হয়ে যাচ্ছে। সন্ধ্যা হয়ে যাবে। অনেক দিন ধরে কাকার বাড়িতে যাইনা। রাত্রি ছোট থাকতে যেতাম। এখন কোন প্রয়োজন হলে যাই।


ওদের বাড়িতে গিয়ে দেখলাম কাকি রান্না করছেন। কাকিকে বললাম, রাত্রির কি কোন অসুখ টসুখ হলো নাকি? আজকে স্কুলে গেল না কেন?

চুলার আগুন বার বার নিভে যাচ্ছে। কাকি বার বার ফু দিতে দিতে বললেন, মেয়ে মানুষের আর কতো পড়াশুনা করতে হবে? এইযে আমাকে দেখ। পড়াশুনা তো আমিও করেছিলাম। এখন কি করছি?

কাকির কথাটা আমার মনে প্রচন্ডভাবে আঘাত করল। আমি বুঝতে পারলাম অনেকটা আক্ষেপ নিয়ে কথাটা বলল কাকি। আমার বার বার বলতে ইচ্ছে করলো, তুমি যেভাবে কষ্ট পাচ্ছো, তোমাদের মেয়েদেরও কি সেভাবেই কষ্ট দিবে?

: রাত্রি কোথায়?

: ঘরে।

আমি মেয়েটাকে ডাকতে ডাকতে ঘরে প্রবেশ করলাম।



পর্ব ০২


রাত্রির ঘরটা ঘুটঘুটে অন্ধকার। আমি বাইরে থেকে ওকে একবার ডাকলাম। বললাম, "ঘর এমন অন্ধকার করে রেখেছিস কেন রে?" তবে রাত্রি আমার কথার কোন জবাব দিলো না। আমি দরজার কাছে গিয়ে আরেকটু উকি দেওয়ার চেষ্টা করলাম। তারপর আবার বললাম, এভাবে এই সন্ধ্যাবেলায় শুয়ে আছিস কেন? জ্বর ট্বর এসেছে নাকি?

: তুমি চলে যাও ভাইয়া।

রাত্রির কান্না জড়িত কণ্ঠ শুনে আমার আর সহ্য হলো না। আমি বুঝতে পারলাম সব। লাইট জ্বালানোর পর দেখলাম রাত্রি গুটিশুটি হয়ে দেয়াল ঘেষে শুয়ে আছে। রাত্রি আমাকে আবার বলল, বাতিটা নিভাও প্লিজ। আমার ভাল্লাগছে না।

রাত্রির কাছে গিয়ে বললাম, কান্না করছিস কেন?

: জানিনা।

: শোন। আমি রাতে আমার বাবাকে সব বলেছি। এখন তোর বাবার সাথে এসব নিয়ে আলোচনা করবে।

: কোন লাভ হবে না। তোমাদের ছেড়ে চলে যাবো। আমাদের দুজনের আর একসাথে স্কুলে যাওয়া আসা হবে না।

: এভাবে কেন বলছিস? আমার বুঝি খারাপ লাগে না?

: তোমার কেন খারাপ লাগবে? তোমার তো খুশি হওয়ার কথা। তুমিই তো মাঝে মাঝে বলো, আমার জন্য তুমি তোমার বন্ধুদের সাথে খেলতে পারো না। এখন থেকে তোমার মুক্তি।

: এভাবে বলিস না প্লিজ। আমি চেষ্টা করবো কিছু একটা করার।

: থাক। তোমাকে কিছুই করতে হবে না। চলে যাও প্লিজ। আমার মোটেও চলে যেতে ইচ্ছে করছে না। ওর মাথায় একটু হাত বুলাতে পারলে মনে একটু শান্তি পেতাম। কিন্তু পারলাম না। বাতিটা আবার নিভিয়ে দিলাম। কান্না করুক ও। প্রতিটা মানুষের জীবনে এমন একটা কষ্টের মুহুর্ত আসেই, যখন তার কান্না করা অনেক প্রয়োজন। ওদের বাড়ি থেকে চলে আসলাম সেদিন। যাওয়ার সময় কাকিকে বলে আসলাম, "আপন নয় বলেই কাউকে ইচ্ছে করেই কষ্ট দিতে হয় না। এর ফলাফল নিজের কাছেই ফিরে আসে।" কথাটা বলে এক সেকেন্ডও দাঁড়ালাম না সেখানে। চলে আসলাম বাড়ির দিকে।


সেদিনের পর থেকে আমার পড়াশুনা খাওয়াদাওয়া ঠিকমতো কিছুই হচ্ছে না। বাবা রাতে বাসায় আসে। বাবাকে রাত্রির কথা অনেকবার বলি। বাবা আমার কথায় পাত্তা দেয় না। সেদিন শোয়ার সময় আবার বাবার কাছে গেলাম। বাবা আমাকে দেখেই বলল, আজকেও এসেছিস?

: আমার কিছুই ভালো লাগছে না বাবা।

বাবা আমার কথায় চুপ করে রইলেন। আমি আবার বললাম, রাত্রির বিষয়ে কাকাকে বলেছিলে?

তবুও বাবা কিছুই বলছে না। আমি শেষমেশ রাগ করে বলেই ফেললাম, কেমন বাবা হয়েছো তুমি? ছেলের কিছুই বুঝতে চাও না। সারাদিন বাড়িতে থাকো না। রাতেও ভালোভাবে কথা বলছো না। আচ্ছা। আর আসবো না বিরক্ত করতে।

বাবাও আমাকে কড়া গলায় বললেন, তোর কাকা না করে দিয়েছে। তিনি বলেছেন, ওই লোকটার সাথেই তার বিয়ে হবে। আর তোর কি বয়স হয়েছে নাকি? কোন ক্লাসে পড়িস তুই? কার কামাই খাচ্ছিস? বিয়ে করার এতোই শখ হয়েছে তোর? বাবার কথায় আমার মনটা সেদিন অনেকটা খারাপ হয়ে গেল। একটা জিনিস পারবে না বলে তাই এইভাবে অপমান করলো আমাকে? আজকে মা বেঁচে থাকলে মেয়েটার কষ্টটা বুঝতো। বাবা এখনো সেটা বুঝতে পারে নি। তার কাছে মনে হচ্ছে, টাকা থাকলেই সেই টাকা দিয়েই সুখ কিনে ফেলা যায়। কই? তার বাবার তো টাকাপয়সার অভাব নেই। ব্যাবসাপাতি করে অনেক টাকা কামিয়েছে তার বাবা। কিন্তু কই? মনে হয় এই বাড়িতে আহামরি কিছুই নেই।


কোনমতে এসএসসি পরিক্ষাটা দিলাম। তারপর ভাবলাম শহরে চলে যাবো। এই গ্রামে আসলেই আমার কেউ নেই। ঢাকার ভালো একটা কলেজে আমার চান্স হলো। তারপর একদিন ব্যাগপত্র গুছিয়ে রওনা হলাম ঢাকার উদ্দেশ্যে। ভাবছি, বাসায় আর আসবো না সহজে। ওখানেই নিজেকে আস্তে আস্তে গড়ে তুলবো। ব্যাসস্ট্যান্ডে আসার পর বেঞ্চের উপরে বসলাম। বাসের জন্য অপেক্ষা করছি। সবকিছুই ঠিক ছিলো। হঠাৎ আমার পাশে ধপাস করে একটা শাড়ি পড়া মেয়ে বসে পড়ল। প্রথমে আমি চিনতে পারি নি। কিন্তু পরে তাকিয়ে দেখার সাথে সাথে অবাক হলাম আমি। "রাত্রি?"

: আমাকে তোমার সাথে নিয়ে চলো ভাইয়া।

: তুই কি পাগল হয়ে গেছিস?

: আমি তোমাকে ছাড়া থাকতে পারবো না। প্লিজ আমাকে নিয়ে যাও তোমার সাথে।

: ছেলেমানুষি কেন করছিস? এখন বড় হয়েছিস, নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে, বিয়ে করে সংসারী হতে হবে।

: আমি কিছুই বুঝতে চাই না। তোমাকে ছাড়া মরে যাবো আমি প্লিজ।

: কেউ আসলে কারো জন্য মরে না। আর আমি যাচ্ছি পড়াশুনা করতে। আমি তোকে নিয়ে কোথায় যাবো?

: তুমি আর আমি ছোট্ট একটা সংসার বানাবো। অভাব থাকলে থাকবে। কিন্তু তুমি আমার পাশে থাকবে।

: বুঝেছি, তোর মাথায় সমস্যা হয়েছে। একটু পরেই বাস চলে আসবে। বাড়ি চলে যা। তোর বিয়ে যেন কবে?

: বিয়ে করবো না আমি।

: এভাবে বলিস না প্লিজ। মানুষ কোন কিছু চাইলেই কি সেটা পায়? কিছু কিছু জিনিস অপুর্ণই থাকে বুঝলি?


এই প্রথম রাত্রি আমাকে জরিয়ে ধরে প্রচন্ড রকমের কান্না করতে আরাম্ব করলো। কিছুক্ষনের জন্য একবার মনে হলো, মেয়েটাকে নিয়ে আসলেই দূড়ে কোথাও চলে যাই। সেখানে কেবল রাত্রি আর আমি। আর কিছুক্ষনের মধ্যেই বাস চলে আসবে হয়তো। আমি অনিচ্ছা সত্বেও রাত্রিকে দূরে সরিয়ে দিলাম। বললাম, আমাকে মাফ করে দিস রাত্রি। আমি তোর জন্য অনেক দোয়া করবো। দেখিস তুই অনেক সুখে থাকবি।

: আমি তোমাকে ছাড়া কখনোই সুখে থাকতে পারবো না।


বাস এসে পড়লো। রাত্রি সহজে আমার হাত ছাড়তে চাইলো না। একটা ঝাকি দিয়ে নিজের হাতটা ওর হাত থেকে ছাড়িয়ে নিলাম। তখন সেদিন নিজেকে প্রচন্ডরকম অপরাধী মনে হয়েছিলো। রাত্রির দিকে পুনারায় তাকানোর সাহস পেলাম না।এই অপরাধের ক্ষমা কি সে আমাকে করবে? মনে হচ্ছিলো এখনি আমার হৃদয়টা ফেটে যাবে। শব্দ করে কান্না করতে ইচ্ছে করছিলো তখন। বাসের ভিতরে অনেক মানুষ। সিটে বসার পর জানালা দিয়ে আমি একবার রাত্রির দিকে তাকালাম। দেখলাম মেয়েটা কান্না করছে। ওর চোখের পানিতে দুটি গাল চকচক করছে। আজকে যাবার সময় জীবনে প্রথম খেয়াল করলাম, শাড়ি পরে ওকে দারুন মানায়।


কখন অন্ধকার হয়ে গেছে খেয়ালই করি নি। বাসের ভেতরের জানালাটা আটকে দিলাম। পৌছতে আর বেশি সময় লাগবে না। আমি সামনের সিটে তাকিয়ে দেখলাম সামনের সিট ফাঁকা। সেই দুইজন মনে হয় বাস থেকে নেমে গেছে। সাথে সেই মিষ্টি গন্ধটাও। বাসের হেলপারকে বললাম আর কতো সময় লাগবে। তিনি বললেন আর ঘণ্টাখানিক লাগবে। তারপরই শহর ছেড়ে গ্রামে চলে আসবে গাড়িটা। এখনো কি গ্রামের সবকিছু আগের মতোই আছে? আমার তা মনে হয় না। এই কয়বছরে অনেক কিছুই পরিবর্তন হয়েছে। এদিকের রাস্তাঘাট, দোকানপাট কিছুই চেনা যাচ্ছে না। বাসের হেলপারের সহায়তায় সেদিন আমার গ্রামে আসলাম। গ্রামের মাটিতে যখন পা ফেলেছি তখন রাত প্রায় দশটা। নাহ। যা মনে করেছিলাম, তেমনটা হয় নি। গ্রামটা সেই আগের মতোই আছে মনে হচ্ছে। আগের মতোই গাছপালা। এদিকটায় শুনশান রাস্তা। দূরে একটা দোকান দেখা যাচ্ছে। দোকানের কাছে যাওয়ার পর দেখলাম মালামাল তেমন একটা নেই। কেরোসিনের বাতি। এই যুগে এখনো কেউ কেরোসিনের বাতি ব্যাবহার করে? দোকানের কাছে যাওয়ার পর আমি লোকটাকে বললাম, এতো রাতে এখানে দোকান খুলে বসে আছেন, এদিকের কাস্টমার কোথায়? লোকটা আমার দিকে না তাকিয়েই জবাব দিলো, রাতের বেলা এদিকটায় কেউ আসে না। মাঝে মাঝে দুই একজন আসে। তাদের কাছে কিছু বিক্রি করি। তা তোমার কিছু লাগবে নাকি বাবা?

: আচ্ছা। এদিকে কোন ভ্যানগাড়ি পাওয়া যাবে এখন?

: এতো রাতে এদিকে নাও পাইতে পারো। তবে যদি পাও, তবে তোমার ভাগ্য ভালো। মাঝে মাঝে দু একটা ভ্যান যেতেও পারে। তুমি বরং আমার দোকানে কিছুক্ষন বসো।

বাসের ভিতরে খাওয়াও হয়নি কিছুই। ভাবলাম দোকান থেকেই কিছু কিনে খাই। গ্রামের ঠান্ডা বাতাসে শীত শীত লাগছে। রাস্তা ভেঁজা। বৃষ্টি হয়েছে মনে হয় এদিকটায়। লোকটা আমাকে বলল, তা কই যাবা মিয়া? আমি বললাম, যাবো পাথালিয়া গ্রামে। ঢাকা থেকে আসলাম।

: ওই গ্রামে কি তোমার?

: আজ্ঞে! আমার দাদুর বাড়ি ওইখানে। আপনার গ্রাম কোথায়?

: আমার বাড়ি এখানেই। আগে শহরে থাকতাম। তা আমার ভালো লাগলো না। তাই চলে এলাম গ্রামে। শহরে থাকলে যদিও কটা টাকা বেশি কামাতাম, কিন্তু এখানেও বেশ ভালোই আছি।

আমি লোকটার কথা শুনে একটু হাঁসলাম। লোকটার অবস্থা তাহলে আমার মতোই। বললাম, চলে আসার কারণ কী?

লোকটা বলতে যাচ্ছিলো, সে এক বিশাল ঘটনা....

কিন্তু লোকটার ঘটনাটা আর শোনা হলো না। একটা ভ্যানগাড়ি চলে আসলো তার মধ্যে। ভ্যানটা থামিয়ে বললাম, পাথালিয়া যাবেন? ভ্যানচালক রাজি হলো না। এখন রাত সারে দশটা। লোকটা হয়তো বাড়ি চলে যাবে। বললাম, ভাড়া নিয়ে চিন্তা করবেন না। যত চাইবেন ততই দিবো।

তিনি বললেন, ওইদিকের রাস্তা অতোটা ভালো না। ভাঙ্গা। তারমধ্যে আজকে বৃষ্টি হইছে, পিছলা। আমার আর দোকানদারের জোরাজুরিতে ভানচালক অবশেষে রাজি হল। ব্যাগপত্র নিয়ে ব্যানে বসে পড়লাম।

: কতক্ষন লাগবে ভাইজান?

: এক ঘন্টার মতো লাগবার পারে। রাস্তা ভালো থাকলে পঁনেরো মিনিটের মধ্যে যাইতে পারতেন। কিন্তু কি আর করার। আর এদিকটায় আমিও বেশি আসি না। কয়জনের মুখে শুনছি জায়গাটাও নাকি ভালো না।

: জায়গাটা ভালো না বলতে?

: মানে ওইদিকে ভুত আছে শুনছিলাম।


অনেকদিন পর মনে হয় আজকে ভুতের কথা শুনলাম। শহরের জীবনের সাথে খাপ খাওয়ানোর পর থেকে ভুলেই গেছি ভুত বলে একটা টার্ম আছে। এবং কিছু লোকেরা এটা প্রচন্ডরকমভাবে বিশ্বাস করে। রাত্রির কথাটা আমার আবার মনে পড়লো। ভুতের ভয় ছিলো বলেই আমার সাথে রাত্রির পরিচয় হয়েছিলো। এসব ভাবতে ভাবতে ভ্যানে করে যাচ্ছি। ভ্যানচালককে জিজ্ঞাস করলাম, আপনার বাড়ি কই?

লোকটা বলল, তার বাড়ি এই গ্রাম থেকেও অনেক দূর। আজকে তার বাড়ি যেতে যেতে অনেক অনেক রাত হয়ে যাবে। আকাশে কালো মেঘ জমেছে। বৃষ্টি আসতে পারে। বুঝতে পারলাম ভ্যানচালক খুব সাবধানে তার ভ্যানটা চালাচ্ছে। আমি বললাম, একটু তারাতারি চালান প্লিজ। বৃষ্টি আসবে মনে হচ্ছে। দক্ষিনে বৃষ্টি ডাকছে। আমি জানি লোকটা তার সাধ্যমতো চেষ্টা করে যাচ্ছে। এখানে আমার কথায় কোন যায় আসে না। আমার যেমন তাড়াহুড়া, উনারো ঠিক তেমনই তাড়াহুড়া।


সবকিছু ঠিকই চলছিলো। হঠাৎ করে কি থেকে কি হয়ে গেল জানিনা। মনে হচ্ছে অল্প সময়ের জন্য আমি জ্ঞান হাড়িয়েছি। আমার জ্ঞান আসার পর দেখলাম সেই ভ্যানচালক লোকটা আমাকে বলছেন, ঠিক আছেন আপনে?

আমি চোখ মেলে আশেপাশে সবকিছু বোঝার চেষ্টা করলাম। দেখলাম, আমি পুরো একটা খাদে। আমার ঠিক ডানপাশে ভ্যানগাড়িটা উলটে পড়ে আছে। উঠতে গিয়ে দেখলাম আমার শরিরে কাঁদা লেগে আছে এবং বুঝলাম শরিরে ব্যাথাও লেগেছে ভালোই। ভ্যানচালক লোকটি আমাকে ব্যাগসহ সেই খাদ থেকে টেনে তুললেন। তারপর ব্যাগটা আমার হাতে দিয়ে বললেন, কিছু মনে নিয়েন না দয়া করে। আপনার অনেক ক্ষতি করলাম। আপনার ভাড়া দেওয়া লাগবে না। আর একটু হাঁটলেই সামনেই পাথালিয়া। আমার মনে হয় সময় লাগবে না। আমার ভ্যানগাড়িটার মেলা ক্ষতি হয়ে গেল। কালকে সকালে তুলতে হবে খাদ থেকে।

ভ্যানচালক লোকটার জন্য অনেক মায়া হলো। আমার জন্যই বেচারার এমন হলো। আমি লোকটাকে কিছু টাকা সাধলাম। কিন্তু তিনি নিলেন না। অনেক চেষ্টা করেও দিতে পারলাম না। শেষমেশ বললাম, আচ্ছা। কিছু মনে নিয়েন না। আমার জন্যই এতো কিছু হলো। কি আর করার, ভাগ্যে হয়তো এমন লেখা ছিলো। লোকটাকে বিদায় দিয়ে অগত্যা ব্যাগটা হাতে নিয়ে হাঁটতে লাগলাম। অনেক ভারী ব্যাগ। হাতে ব্যাথা করছে। মাথার মধ্যে যন্ত্রনা হচ্ছে। বুঝতে পারলাম, মাথায় ভালো একটা চোট লেগেছে। এতোক্ষন সেটা বোঝা না গেলেও এখন কপালের একপাশে হাত দিয়ে দেখলাম সেখানটাতে ফুলে গেছে। কপালে কাঁদা লেগেছে এবং হাতটা ভালোভাবে দেখার পর বুঝলাম কেঁটে রক্ত বের হচ্ছে।


আধাঘন্টা ধরে হাঁটছি। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলাম, বারোটা বেঁজে গেছে রাত প্রায়। পায়ের অবস্থাও ভয়াবহ। এগোতেই চাইছে না। আর তার মধ্যে এই ভারী ব্যাগটা। আরো একটু হাঁটার পর দূরে দেখলাম একটা আলো জ্বলছে। চকচকে আলো। আরেকটু হেঁটে কাছে যাওয়ার পর বুঝলাম একটা একতলা দালান। উপরে একটা সাইনবোর্ড ঝুলানো। যতই কাছে যাচ্ছি লেখাটা আমার কাছে স্পষ্ট হচ্ছে। একটা হাসপাতাল। সাইনবোর্ডে লেখা: "আশালতা হাসপাতাল"। আমি গ্রামে থাকতে এটা ছিলো না। যাক, গ্রামটা তাহলে বেশ ভালোই উন্নত হয়েছে।

হাসপাতালের দিকে পা বাড়ালাম। এতো রাতে কোন ডাক্তার পাওয়া যাবে না। কিন্তু কাউকে না কাউকে তো অবশ্যই পাওয়া যাবে। মাথার ক্ষতটা পরিষ্কার করে একটা ব্যান্ডেজ নিতে পারলে ভালো হত। হাসপাতালে ঢুকার পর দেখলাম সুন্দর একটা শহুরে ব্যাপার। এটা যে গ্রামেও পাবো তা কল্পনাও করতে পারি নি। ভিতরে যাওয়ার পর দেখলাম মানুষজন নেই অতোটা। শহরের হাসপাতাল থাকলে চব্বিশ ঘণ্টা রোগীদের সিরিয়াল লেগেই থাকতো। গ্রামের পরিবেশ ভালো। মানুষের রোগবালাই কম হয় হয়তো এদিকটায়।


আরো ভিতরে যাওয়ার পর একটা মানুষের দেখা পেলাম। একজন নারী। আমি তাকে ডাকার চেষ্টা করলাম। বললাম, "এক্সকিউজ মি, শুনতে পাচ্ছেন? একটু আসুন এদিকে প্লিজ"। মেয়েটা আমার কাছে আসলো। এসে আমাকে পর্যবেক্ষণের দৃষ্টিতে আমার সবকিছু একবার দেখে নিলো। আমি বললাম, রাস্তা দিয়ে আসার সময় ভ্যানগাড়িটা উলটে গেছিলো। মাথায় বড্ড চোট পেয়েছি। একটু ব্যান্ডেজ করা যাবে?


মেয়েটা এইবার আমাকে দেখে অবাক হয়ে বলল, আনিস ভাইয়া। আমাকে চিনতে পারো নি?

আমার চোখ চকমক করে উঠলো। অতীতের সাথে আমাকে মিলাতে পারছি না। আমার সামনে এ কে? কি অবস্থা হয়েছে ওর?

: আমাকে চিনতে পারো নি ভাইয়া?

আমি যেন থ হয়ে গেলাম। মুখ দিয়ে কোন কথা বের হচ্ছে না। মেয়েটা এবার আমার দুইহাত শক্ত করে ধরে বলল, আমি তোমার সেই রাত্রি। কখন চোখ দিয়ে দুফোঁটা জল গড়িয়েছে তা টেরও পাই নি। বললাম, কেমন আছিস রাত্রি?

: তোমাকে সেদিন কতোবার করে বললাম, আমাকে নিয়ে যাও। আমার কথা তো শুনলে না। তোমাকে ছাড়া আমি মোটেও ভালো নেই।

: তা এখানে এই হাসপাতালে তুই?

: আজকে এখানে আমার নাইট ডিউটি ভাইয়া।

: কিন্তু এখানে কেন? তোর না বিয়ে হয়েছিলো?

: সেকথা আর বলো না। সে অনেক কাহিনি। এখন বলো তুমি কেমন আছো?

: আমিও আছি কোনোরকম। তোর কথা আমার কতো মনে পড়েছে।

: হয়েছে এতো রাত্রে তোমার আর বাড়িতে গিয়ে কাজ নেই। এখানেই অনেকগুলো কেবিন খালি আছে কোনমতে রাতটা পার করে দিতে পারবে। তোমার ব্যাগটা আমার কাছে দাও। তুমি বরং ফ্রেস হয়ে আসো। শরিরের কাঁদাগুলো পরিষ্কার করবে। ইস কতোখানি কেঁটে গেছে দেখেছো? সেলাই লাগবে।


রাত্রি আমাকে একটা কেবিন দেখিয়ে দিলো। হাসপাতালের কেবিন। একটা সিংগেল বেড। একটা অসহ্য গন্ধ নাকে আসছে। হাসপাতালে এটা স্বাভাবিক। আমি ফ্রেশ হতে গেলাম। বেসিনের আয়নায় এই প্রথম দেখলাম খুব বড় একটা ক্ষত হয়েছে আমার কপালে। প্রথম প্রথম যদিও ব্যাথা বোঝা যায় নি। এখন ব্যাথা বাড়ছে। শরির থেকে একটা দুর্গন্ধ আসছে। পচা পাতার গন্ধ। গোছল না করলে এটা যাবে না। তবুও কোনভাবে শরিরটা একটু পরিষ্কার করে নিলাম। ক্ষতস্থানের ময়লাটা বের করলাম। নিজের শরিরটা কিছুটা পরিষ্কার করার পরে কেবিনে গিয়ে ঢুকলাম। একটু ঘুমানোর প্রয়োজন ছিলো। মাথাটা বড্ড ঝিম ঝিম করছে। কিন্তু পেটে এই পরিমান ক্ষুধা নিয়ে আমার মোটেও ঘুম আসবে না।

তবুও বিছানায় গিয়ে কিছুক্ষনের জন্য একটু শুলাম। একটু পরেই রাত্রি আসবে। বলেছে, কপালে একটা শেলাই লাগবে। কিন্তু এতো দেড়ি করছে কেন? এই মুহুর্তে কেন যেন আমার সবকিছু স্বপ্নের মতো লাগছে। আচ্ছা। একটু চিমটি দিয়ে দেখলাম নিজের গায়ে। নাহ্। ব্যাথা আছে। তারমানে বাস্তবই সবকিছু। এই কদিন শুধু সারপ্রাইজ পাচ্ছি। আরুর চলে যাওয়া, রাত্রির সাথে দেখা হওয়া, এগুলো একেকটা বড় বড় সারপ্রাইজ। তবে আরেকটা সারপ্রাইজ আমার জন্য অপেক্ষা করছিলো। সেটা দেখার পর আমি কথা বলার ভাষা খুঁজে পেলাম না।


রাত্রি আমার কেবিনের দরজার কাছে আসলো। রাত্রি শাড়ি পরেছে। আরুকে দেওয়ার জন্য একটা শাড়ি কিনেছিলাম। ভেবেছিলাম ওকে সারপ্রাইজ দেবো। কিন্তু নিজেই সারপ্রাইজ হয়ে গেলাম। তাই ব্যাগের মধ্যে শাড়িটা নিয়ে এসেছিলাম।

রাত্রিকে বললাম, আমার ব্যাগ খুলেছিলি?

: হ্যাঁ। খুলেছিলাম। শাড়ীটা খুব পছন্দ হয়েছে ভাইয়া। কার জন্য ছিলো গো?

: সে অনেক ব্যাপার। পরে বলবো। এখন থাক।

: না। পরে আর সময় হবে না হয়তো, আজকেই বলতে হবে। এই মুহুর্তে বলতে হবে। ছাদে চলো। দারুন লাগবে। অনেক দিন পর পেয়েছি তোমাকে আজকে, জানো আমার কত্তো ভালো লাগছে।

: তুই নাকি কপালে সেলাই দিয়ে দিবি।

: হুম। ফার্স্ট এইড বক্স আছে সাথে। ছাদে সুন্দর আলো আছে। তোমার গল্প শুনবো।


অনেক দিন পর মনে হয় আকাশে চাঁদ আর তারা একসাথে দেখলাম। শহরে এতো আলোক দূষনের কারণে চাঁদটাও সুন্দরভাবে দেখা যায় না। ছোঁড়া ছোঁড়া মেঘ দেখা যাচ্ছে আকাশে। ঠান্ডা বাতাস। বৃষ্টি হওয়ার যে একটা লক্ষন ছিলো সেটা কেঁটে গেছে। একটা বেঞ্চ পাতা আছে ছাদে। রাত্রি আমাকে বেঞ্চটাতে বসতে বলল। রাত্রি ফার্স্ট এইড বক্সটা খুলল। আমি রাত্রিকে বললাম, জানিস, তোকে আমার চেয়েও বড় বড় লাগছে। মনে হচ্ছে তুই আমার বড় বোন। এসব তো ডাক্তারদের কাজ, তুই পারিস?

: ট্রেনিং নিয়েছি, মোটামুটি অনেক কিছুই পারি, আমি এখনো সেই আগের মতো ছোট নেই। আগে তো তোমার সাথে কতো ছেলেমানুষি করেছি। মাঝে মাঝে এখন সেসব ভাবলে লজ্জা লাগে।

রাত্রি কথা বলছে আর নিশ্চিন্তে চিকন ধারালো সুইটাতে সুতা লাগালো। মনে হলো অনেক দক্ষ হয়ে গেছে ও। রাত্রি বলল, মাথাটা এদিকে আনো তো ভাইয়া। আমি কপালটা ওর কাছে নিয়ে গেলাম। রাত্রি একটা তুলার মধ্যে অসুধ লাগিয়ে নিয়ে আমার ক্ষতস্থানটা মুছে দিলো। রাত্রি বলল, ভাইয়া একটা বলি?

: হুম। বল।

: আমাকে কি তোমার পছন্দ হয়েছিলো না?



পর্ব ০৩


রাত্রি বলল, আমাকে কি তোমার পছন্দ হয়েছিলো না?

রাত্রির কথাটা শুনে আমি এর কী উত্তর দিবো তা ভেবে পেলাম না। চুপ করে রইলাম। তারপর রাত্রি নিজেই বলল, থাক। বলতে হবে না। কার পছন্দ হলো আর কার হলো না সেটা নিজেদের ব্যাক্তিগত মনের ব্যাপার। এখানে নিজে এতো কিছু ভেবে কষ্ট পাওয়ার কোন মানেই হয় না। আমি বললাম, এখন এসব ভেবে এতো লাভ নেই। যা হওয়ার তা তো হয়েই গেছে। এইবার বল, তোর তো বিয়ে হয়েছিলো। তা এখানে কেন?

: বলতে পারো আমার ভাগ্য খারাপ। সবকিছুই হারিয়ে ফেলি। যেই জিনিসটা বেশি ভালোলাগে, সেটাই হারিয়ে যায়। বিয়ে করে ভেবেছিলাম, সবকিছু ভুলে গিয়ে আবার নতুন করে সবকিছু শুরু করবো। কিন্তু হলো না।

: কেন? কি হয়েছিলো?

: কেউ জানতো না তার আগেও একটা স্ত্রী ছিলো। ছেলেমেয়ে ছিলো। বিয়ে করে আমার সাথে দাসীর মতো আচরণ করে। এতোই যখন কাজের লোকের অভাব একটা কাজের বেটি রাখতো। আমাকে কেন বিয়ে করলো। কোন ভুল ত্রুটি হলেই নানার রকমের নির্যাতন করতো। তাই একদিন পালিয়ে চলে এসেছিলাম। পালিয়ে এসেছি বলে, বাবা-মাও কতো খারাপ খারাপ কথা বললো। সেগুলো এখনো আমার কানে বাঁজে। বুঝতেই তো পারছো। তখন কতো ছোট ছিলাম আমি। ওইরকম বয়সে কতোটা ঝড় আমার মধ্যে দিয়ে গিয়েছে।

একটু সময়ের জন্য মনে হচ্ছিলো, রাত্রিকে সেদিন সত্যিই আমার সাথে নিয়ে যাওয়া উচিৎ ছিলো। আমি সত্যি অনেক বড় একটা ভূল করে ফেলেছি।

রাত্রি আবার বলতে লাগলো, শেষমেশ বাবা আমাদের ডিভোর্সের ব্যাবস্থা করলেন। একে তো আমি সৎ মেয়ে। তারমধ্যে স্বামী তালাক দিলো। সংসারের পুরো বোঁঝা হয়ে গেলাম আমি। মা-বাবা উঠতে বসতে নানা কথা বলতো। শেষমেশ নিজেই বাসা থেকে চলে আসি। অনেক জায়গা থেকে সম্ভোন্ধ আসতো। পছন্দ হয়নি। তালাকপ্রাপ্তা বলে এক্কেবারে পঁচে যাই নি। তাই শেষমেশ এখানে একটা চাকরি পেলাম। এখন কিছুটা ভালোই কাঁটছে বলতে পারো।

: আমাদের বাড়ির সবাই কেমন আছে জানিস?

: অনেকদিন দেখা হয়না।

: কেন? যাসনা?

: না।

: কোথায় থাকিস?

: এই হাসপাতালটা কি দেখতে অনেক খারাপ? এখানে থাকতে ভালোই লাগে।


কথা বলতে বলতে রাত্রি একসম বলল, তোমার সেলাই শেষ হয়ে গেছে। এখানেই বসে থাকবে নাকি চলে যাবে? আমি বললাম, "আজকের মতো থাক। পরেও এসব নিয়ে আলোচনা করা যাবে।" দেখলাম রাত্রির চোখ ছলছল করে উঠছে। রাত্রি আজকেও অনেকটা মায়া জড়ানো কণ্ঠে বলল, একটু বসো না ছাদে প্লিজ।

আমি বললাম, আজকে থাক। বড্ড ঘুম পাচ্ছে। আজকে সারাদিন অনেক ধকল গিয়েছে নিজের উপর দিয়ে। এই কথা বলে চলে আসলাম রাত্রির কাছ থেকে। রাত্রি আমার যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইলো বুঝতে পারলাম।


রুমে এসে শুয়ে পড়লাম। মাথার ব্যাথাটা অনেক কমেছে। কপালের এক পাশে হাত দিয়ে দেখলাম সেখানে কয়েকটা সেলাই দেওয়া হয়েছে। বুঝতে পারলাম বেচারির এই কয়েকদিনে অনেক অভিজ্ঞতা হয়েছে। আমার ভাবতেই অবাক লাগছে, সেদিনের সেই ছোট্ট মেয়েটা আজকে কত্তো বড় হয়ে গেছে। মাথাটার ব্যাথা একটু কমলেও শরিরের ব্যাথা এখনো কমে নি। হাতে পায়ে কিছু কিছু জায়গায় কেঁটে গেছে। কেঁটে ফুলেও গেছে।


কখন চোখের পাঁতা নেমে এসেছে জানা নাই। মাথাটা একটু হালকা লাগছে। এর ফলে বুঝতে পারলাম কিছুক্ষনের জন্য ঘুম হয়েছিলো। ভালোই ঘুম হয়েছে। দূরে কিসের যেন চিৎকার চেঁচামেচির আওয়াজ আসছে। হাসপাতালে এসব দৃশ্য স্বাভাবিক। আমার কিছুক্ষনের জন্য মনে হচ্ছে দূরে কোথাও মানুষের তীব্র আর্তনাদ শোনা যাচ্ছে। মনে হচ্ছে, কোন মানুষ মারা গেছে। কে মারা গেল? আরেকটা জিনিস খেয়াল করে আমার পুরো গা শিরশির করে উঠলো। কান্নার শব্দগুলো যেন আরো আমার দিকে এগিয়ে আসছে। কানে অসহ্য এক ধরনের অনুভুতি হচ্ছে।

হঠাৎ করে রুমের ভিতরে রাত্রি এসে ঢুকল। হালকা আলোয় দেখলাম রাত্রি পুরো ঘেমে অস্থির। এসেই হাপাতে হাপাতে আমাকে বলল, ভাইয়া তারাতারি এখান থেকে চলে যাও। রাত্রি আমার ব্যাগটা আমার হাতে দিয়ে বলল, "এক দৌড়ে এখান থেকে চলে যাও ভাইয়া, একবারের জন্যও তাকাবেনা প্লিজ পেছন দিকে।" আমি রাত্রির কথার আগামাথা কিছুই বুঝতে পারছি না। চিৎকারের শব্দ আরো বাড়ছে।

আমি যেতে চাচ্ছি না। বলতে গেলে রাত্রি আমাকে এক ধাক্কা দিয়ে কেবিন থেকে বাইরে পাঠিয়ে দিলো। পেছন থেকে রাত্রি বলল, চলে যাও ভাইয়া। দৌড় দাও। পেছনে তাকাবে না বললাম।

প্রথম প্রথম এদিকে চকচকে বাল্ব ছিলো। এখন পুরো হাসপাতালটা অন্ধকার। চিৎকার শোনা যাচ্ছে। কিন্তু আশেপাশে কোন মানুষ দেখতে পাচ্ছি না। রাত্রি এখনো দূর থেকে বলছে, তারাতারি যাও।

শেষমেশ হাসপাতালটা থেকে বের হয়ে আসলাম। মেয়েটা বলেছে পেছনে তাকানো যাবে না। তাই পেছনের দিকে তাকানোর সাহস পেলাম না। কিন্তু হঠাৎ একটা বিকট শব্দ কানে আসলো। পর পর কয়েকটা বিষ্ফোরণের শব্দ। নিজের অবচেতন মনের প্রভাবেই পেছনের দিকে তাকালাম। এবং যা দেখলাম, তা দেখার জন্য মোটেও আমি প্রস্তুত ছিলাম না। আমি দেখলাম পুরো হাসপাতালটাতে আগুনে দাউ দাউ করছে। ভেতরে মানুষের আর্তনাদ কানের ভিতর চিন চিন করে বাঁজছে। এক নিমেষেই হাসপাতালটা পুরে কয়লা হয়ে গেল। রাত্রি? ভেতরে তো রাত্রি ছিলো? ওর কি হলো? আমার পুরো শরিরটা যেন ঠান্ডা হয়ে গেল। সোজা হয়ে আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারলাম না। মাথাটা একটা চক্কর দিয়ে উঠলো। তারপর আমার আর কিছুই মনে নেই।


আমার যখন জ্ঞান আসলো তখন নিজেকে একটা বিছানায় দেখতে পেলাম। এ আমি কোথায়? কিছুক্ষন যেন সবকিছু স্বপ্নের মতো মনে হচ্ছে। তারপর যখন বুঝতে পারলাম তখন আমার চোখ চকচক করে উঠলো। আমারই ঘড় এটা। যখন আমি ছোট ছিলাম। আমি এই ঘড়েই থাকতাম। এই ঘড়ের কোন কিছুই পরিবর্তন হয় নি। বিছানা থেকে উঠে বসলাম আমি। মাথাটা এখনো ঘুড়াচ্ছে। আমার উঠার আন্দাজ পেয়ে যেই লোকটা আমার ঘড়ে আসলো, তাকে দেখে নিজের চোখের পানি আর ধরে রাখতে পারলাম না।

কি অবস্থা হয়ে গেছে বাবার। বাবা আগে কতো স্বাস্থ্যবান ছিলো। এখন শুকিয়ে কেমন হয়ে গেছে। চুল, দাঁড়ি পেকে সাদা হয়ে গেছে। আমি কান্না জড়িত কণ্ঠে বললাম, কেমন আছো বাবা?

: আমাকে চিনতে তোর অসুবিধা হলো না?

: বাবাকে চিনতে কেউ ভুল করে?

: একবারের জন্যও তো খোঁজখবর নিতে পারতি।


হঠাৎ করে আমার গতরাতের কথাগুলো মনে পড়ে গেল। আমি বিছানা থেকে উঠলাম। বললাম, আমাদের গ্রামের হাসপাতালে আগুন লেগেছে বাবা। হাসপাতালের ভিতরে অনেক মানুষ ছিলো। রাত্রিও ছিলো। রাত্রি কেমন আছে বাবা?

বাবা আমার দিকে হা করে তাকিয়ে রইলো। বলল, হাসপাতালের ভেতরে যে রাত্রি ছিলো সেটা তুই কিভাবে জানলি?

: আমি নিজের চোখে দেখেছি বাবা।

: এসব কেমন কথা বলছিস? এটা কিভাবে সম্ভব?

: সত্যি বলছি বাবা।

: তুই কিভাবে নিজের চোখে দেখলি? জানিস এই ঘটনার কতদিন পার হয়ে গেছে? আজ থেকে চার বছর আগে হাসপাতালটাতে বিষ্ফোরণ হয়ে ভয়াবহ আগুন লেগেছিলো। রাত্রি ওই হাসপাতালটাতে নতুন চাকরি নিয়েছিলো। তারপরেই রাতের বেলা একদিন এমন ঘটনা ঘটলো। সেদিন নাইট ডিউটি ছিলো রাত্রির। সকাল বেলা একটা মানুষও আর আস্ত পাওয়া গেল না।


আমি বিছানায় বসে পড়লাম ধপাস করে। বাবা আমাকে পানি দিলেন। পানি আমার গলা দিয়ে নামলো না। তাহলে আমি কোথায় গিয়েছিলাম রাতে? আমার সাথে যেই মেয়েটা ছিলো, সে কে?

বিছানা থেকে উঠে আয়নার সামনে গিয়ে অবাক হয়ে দেখলাম, কপালের ক্ষতস্থানটা এখনো হা করে আছে। কোন সেলাই নেই। তবে রাত্রি যে আমাকে সেলাই করে দিলো? সেটা কোথায় গেল?

বাবাকে বললাম, তোমাদের কতোবার করে বললাম, মেয়েটাকে আমার হাতে তুলে দাও। অনেক যত্নে রাখতাম ওকে। দিয়েছিলে তো তোমাদের পছন্দমতোন মানুষের সাথে বিয়ে। তাহলে ওখানে চাকরি করতে গেল কেন?

: কি আর করার আছে? মেয়েটার ভাগ্য খারাপ। ছোটবেলায় বাবা-মাকে হারিয়েছে। আমাদের আর কি করার আছে?

: সকল দোষ তোমাদের। ওর ভাগ্য খারাপ ছিলো না। তোমাদের চিন্তাভাবনাই খারাপ ছিলো। তোমরা শুধু দেখেছিলে টাকাপয়সা। অথচ মেয়েটার যেই জিনিসটার কমতি ছিলো সেটার দিকে একবারো তাকাও নি।



আমার সামনে পোঁড়া হাসপাতালটা। গতরাতে এইখানেই আমি জ্ঞান হাড়িয়েছিলাম। হাসপাতালটা আর সংস্কার করা হয়ে ওঠে নি। সেভাবেই পড়ে আছে। বিকেল হয়ে এসেছে প্রায়। সুর্য অস্ত যাচ্ছে। অন্যকে দোষ দিয়ে লাভটা কি? দোষটা তো আসলে নিজেরই। রাত্রিকে আমিই অবহেলা করেছি। প্রচন্ডরকম অবহেলা করেছি। এর ক্ষমা আমি হয়তো কখনোই পাবো না। রাত্রির কথাটা এখনো আমার কানে বার বার প্রতিধ্বনি হচ্ছে। "আমাকে কি তোমার পছন্দ হয়েছিলো না?"

আমার বার বার বলতে ইচ্ছে হচ্ছে, আমি তোকে মোটেও পছন্দ করি না। আমরা কেউ তোকে পছন্দ করি না। এই পৃথিবীর কেউ তোকে পছন্দ করে না।



সমাপ্ত

Comments

Popular Posts