এ প্লাস
অন্তর। ছেলেটার খুব শখ ছিলো ক্রিকেটার হওয়ার। বলতে গেলে ক্রিকেট খেলা তার নেশা। কিন্তু সেক্ষেত্রে তার বড় বাঁধা হচ্ছে, তার ফ্যামেলি। অন্তরের বাবা একজন এমবিবিএস ডাক্তার। একটা মাত্র ছেলে তার। তাই তার ছেলেকে নিয়েই জীবনের সবকিছু। তার বাবা যেমন ডাক্তার, এমনকি তাকেও ডাক্তার হতে হবে। এটা তার বাবার ইচ্ছা।
অন্তরের মা শিক্ষকতা করেন। দিনের বেশিরভাগ সময় তাই অন্তরকে একা কাঁটাতে হয়। তার বাবা মা তাদের নির্দিষ্ট কাজে চলে যায়। আর অন্তর চলে যায় স্কুলে। তার স্কুল ছুটি হয় দুপুর দুইটায়। স্কুল থেকে ফিরেই অন্তর ব্যাটবল নিয়ে বাইরে বের হয়। আর ফেরে সন্ধ্যায়।
অন্তর যে বিকেল বেলা ক্রিকেট খেলতে বের হয় এটা কেবলমাত্র তার মা জানে। তার বাবা বিষয়টা জানে না। জানলে ঝামেলা হয়ে যাবে। কারণ অন্তরের বাবার আদেশ, স্কুল থেকে এসে খেয়েদেয়ে পড়তে বসতে হবে। কারণ সামনে এসএসসি পরিক্ষা। যেভাবেই হোক, অন্তরকে এ প্লাস পেতেই হবে। তাই বাবার কড়া আদেশ। এ প্লাস না পেলে ভালো ডাক্তার কোনদিনই হওয়া যাবে না।
অন্তর অনেকবার বলেছে যে, সে বড় হয়ে ক্রিকেটার হতে চায়। নিজের দেশের হয়ে খেলতে চায়। কিন্তু তার বাবা তার কথা কোনভাবেই মেনে নিতে পারে নি। তার কেবল একটাই কথা, আমার ছেলে মাত্র একটাই। এবং তাকে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে কোনভাবেই সে ঠেলে দিতে পারবে না। তাকে ডাক্তার হতে হবে, তার বাবার চেয়ে ভালো ডাক্তার হতে হবে।
কিন্তু অন্তরের ক্ষেত্রে দেখা যায়, তার লেখাপড়ার অবস্থা খুব একটা ভালো না। কারণ সে মনে করে, তার দ্বারা লেখাপড়া হবে না। কারণ, তাকে ক্রিকেটার হতে হবে।
সবকিছু ভালোই চলছিল। যদিও অন্তরের মা মাঝে মাঝেই ছেলেকে বকাঝকা করে। বিকালবেলা পড়তে বসতে বলে। কিন্তু অন্তর এই কথা মোটেও শুনতে রাজি না। তার মতে সকল ছেলেরই উচিৎ বিকেলবেলা খেলাধুলা করা। তার শিক্ষক একবার বলেছিল, বিকেলে পড়া মুখস্থ হয় কম। কিন্তু সেই কথা অন্তরের বাবা শুনতে রাজি না। তার মতে, সময় মুল্যবান। তাই কোনভাবে সেই সময়টাকে অপচয় করা ঠিক না। কারণ, যেই সময় চলে গেছে, তা আর ফিরে আসবে না।
কিন্তু কোন একদিন অন্তরের বাবা কেমনে জানি জেনে গেল যে অন্তর বিকেল বেলা বাইরে খেলতে যায়। সেদিন অন্তর আর কিছু বলতে পারলো না। অন্তরের বাবা তার ছেলেকে এবং তার বউকে যাচ্ছেতাই বকুনি। বিশেষ করে অন্তরের মাকে। "সন্ধ্যায় তো বাসাতেই থাকো। তাহলে ছেলেকে কিভাবে খেলতে পাঠাও। ছেলেটার ভবিষ্যতটা এভাবে ভাংতে লজ্জা করছে না? কিছুদিন পরে ওর এসএসসি পরিক্ষা। এখন নাকি আমার ছেলে লেখাপড়া বাদ দিয়ে ক্রিকেট খেলেতে যায়। বলি, মাথার সব জ্ঞান বুদ্বি কি খেয়ে ফেলেছো?"
তার বাবার কথা শুনে দুজনেই চুপ করে থাকে। যদিও তার মা একবার বলেছিল, "আরে। একটু বাইরে গেলে কী এমন ক্ষতি হবে?"
তার স্বামী অগ্নিশর্মা হয়ে বললেন, কী বললে তুমি? বুঝেছি তুমিও চাও আমার ছেলে ডাক্তার না হয়ে ক্রিকেট খেলুক। বাহ্! ছেলেকে সাপোর্ট দিচ্ছো।
সেদিন অন্তরের বাবা বলে দিলেন, কালকে বিকাল থেকে বাসার টিচার আসবে। এখন থেকে অন্তর বিকালবেলা টিচারের কাছে ম্যাথ আর ইংলিশ পড়বে। পরিক্ষার আগ পর্যন্ত নো ক্রিকেট নো প্লে।
তারপর দিন থেকে আর অন্তর বাইরে যেতে পারে না। স্কুল থেকে এসে খাওয়াদাওয়া করে। গোছল করার আগেই টিচার রুমে এসে বসে থাকে। টিচার ম্যাথ পড়ানো আরাম্ব করে। কিন্তু অন্তর ছোটবেলা থেকেই ম্যাথে দুর্বল। ম্যাথের কনসেপ্টগুলো কোনভাবেই তার মাথায় ঢুকে না। ইংলিশে সে আরো দুর্বল। বিশেষ করে মুখস্ত করার ক্ষমতা প্রায় নাই বললেই চলে।
কিন্তু টিচার ছাড় দেয় না। বাবার আদেশ, প্রচুর হোমওয়ার্ক এবং প্রচুর পড়া দিতে হবে। যাতে ক্রিকেটের চিন্তা মাথা থেকে পুরোপুরি চলে যায়।
কিন্তু অন্তর কোনভাবেই সেই চিন্তা মাথা থেকে বের করতে পারে না। পড়া মুখস্থ হয় না। তার বাবা এ নিয়ে খুব চিন্তা করে। কী হবে এই ছেলেকে দিয়ে? সেবার অন্তর টেস্ট পরিক্ষা দিল। ম্যাথে ১০০ তে পেল ৪৫। আর ইংরেজীতে পেল ৩৮। এই রেজাল্ট সে তার বাবাকে কীভাবে জানাবে? এই রেজাল্ট তার বাবা অবশ্যই জানবে। স্কুলের কোন বিষয়ই তার বাবার থেকে লুকানো যায় না।
হলোও তাই। রাতের বেলা বাসায় এসে তার বাবা বলল, অন্তর! তোর না আজকে রেজাল্ট হয়েছে। তা রেজাল্ট শিটটা কোথায়? অন্তর ভয়ে ভয়ে বাবার কাছে রেজাল্ট শিটটা নিয়ে গেল। অন্তরের বাবা শিটটা হাতে নিয়ে কিছুক্ষন কাগজটার দিকে থ হয়ে তাকিয়ে রইল। তারপর চোখ লাল করে ছেলের দিকে তাকিয়ে ভাড়ি গলায় বললেন, এই তোর রেজাল্ট? সব সাবজেক্টে টেনেটুনে পাস। এত্তোগুলা স্যারের কাছে পড়তে দিয়েছি। আর তোর রেজাল্ট এমন। ছি ছি। পরিক্ষার আর মাত্র ২ মাস বাকি। আর এখন নাকি ছেলে কোনরকম পাস করে। এসএসসিতে এ প্লাস পাবি কিভাবে?
চড় খেয়ে অন্তরের গাল লাল টকটকে হয়ে গেল। তার বাবা বার বার বলছে, এতো টাকা খরচ করে তোর লেখাপড়া করাচ্ছি। এর তুই এর কী প্রতিদান দিলি? অন্তর আর কোন কথা বলল না। চুপ করে শুধু শুনেই গেল। আজ নিজেকে বড্ড অপরাধী মনে হচ্ছে।
তার বাবা একসময় বলল, আর না। তোকে অনেক ছাড় দিয়েছি। আর এক বিন্দুও ছাড় দিবো না। যদি শুনি তুই পরিক্ষার আগে বাইরে খেলতে গিয়েছিস। তোর ভাত বন্ধ। এই দুই মাস শুধু পড়া আর পড়া। রাতেও তোর টিউশনির ব্যাবস্থা করছি।
পরিক্ষার আগের দিনগুলোতে অন্তরকে ঘড়বন্ধী করে রাখা হয়েছে। নিজের বিনোদনের জন্য কোন কিছুই সে তখন করতে পারত না। একটা ঘড়। সেই ঘড়েই এটাচ বাথরুম। কাজের বুয়া অন্তরকে তিন বেলা খাবার দিয়ে যেত। টেস্ট পরিক্ষার পরে স্কুল বন্ধ। তাই আর স্কুলের ছুতো দিয়ে বাইরে যাওয়া হয় না। সকাল বেলা, বিকাল বেলা আর রাতের বেলা টিচার এসে অন্তরকে পড়িয়ে যায়। সেই পড়া আবার অন্তরকে একা একা রেড়ি রাখতে হয়। এত্তো পড়া দেখে অন্তর হতাস হয়ে যায়। বইয়ের দিকে অপলকভাবে তাকিয়ে থাকে। মাঝে মাঝে চোখের পানি ফেলে। এসব কষ্ট আর সহ্য হয় না তার। তার এতো পড়তে ইচ্ছে করে না। ম্যাথের বড় বড় সুত্র আর ইংলিসের লম্বা লম্বা কম্পোজিশন তার মুখস্থ হয় না। কিন্তু এই জিনিসটা তার বাবা বোঝে না। তার বাবা শুধু বোঝে তার ছেলেকে এ প্লাস পেতে হবে। বড় ডাক্তার হতে হবে। সেটা যেভাবেই হোক। এটা করতে গিয়ে সে যদি মরেও যায়। এতেও কোন অসুবিধা নেই।
অনেক রাত হয়ে যায়। ঘুমে অন্তরের চোখ বন্ধ হয়ে আসে। মাঝে মাঝে বইয়ের উপরেই ঘুমিয়ে পড়ে সে। কিছুক্ষন পরে তার বাবা এসে দেখবে অন্তর ঘুমিয়ে আছে। অন্তরের বাবা ধমক দিবেন। ঘাড়ে পানি ছিটিয়ে দিবেন। তারপর টানা বিশ মিনিট গালি দিবেন। কিন্তু অন্তরের মাথায় সেগুলার একটাও ঢুকবে না। কারণ, সে ঘুমের ঘোরে আছে। রাতে আর তার পড়াশুনা হয় না। টেবিলের উপরেই ঘুমিয়ে যায়।
আচ্ছা! এই বিপদ থেকে অন্তর কবে মুক্তি পাবে? এ প্লাস পেলেই তো মনে হয় তার মুক্তি এবং এতেই তার বাবা অনেক খুশি হবে। অন্তর আবার পড়াশুনায় মনোযোগ দেয়। পড়ার চেষ্টা করে। তাকে এ প্লাস পেতে হবে। ডাক্তার হতে হবে। ডাক্তার?
ডাক্তার হওয়ার ইচ্ছা তার কখনোই ছিলো না। সারা জীবন যে ভেবেছে সে একজন ভালো ক্রিকেটার হবে। এবং সেটাই সে হবে। সে অনেক ভালো খেলতে পারে। বন্ধুবান্ধব এমনকি স্কুলের স্যাররাও বলেছে, অন্তর অনেক ভালো ক্রিকেট খেলে। সমস্যা কেবল তার বাবা। তার বাবা সেটা কোনদিন চায় না।
আস্তে আস্তে পরিক্ষার দিনগুলো এগিয়ে আসছে। অন্তরের পড়ার চাপ দিন দিন না কমে বরং বাড়তে লাগল। টিচার আগের চাইতে ডাবল পড়া দেয়। এতো পড়া সে পড়তে পারে না। কিছুদিন পর অন্তর খেয়াল করল, তার মাথা ব্যাথা দিন দিন বাড়ছে। দূরের কোন কিছু সে ভালোমতে দেখতে পারে না। চোখে সমস্যা হয়ে যাচ্ছে।
বাবার নির্দেশ, এই সময়টাতে তাকে কোনভাবেই অসুস্থ হওয়া যাবে না। নিজের শরিরের যত্ন নিতে হবে। অসুস্থ হলে পরিক্ষা মোটেও ভালো হবে না। কিন্তু সে তার বাবার কথা রাখতে পারল না। তার শরির ক্রমশ দুর্বল হয়ে যাচ্ছে। পড়তে গেলেই ঘুম এসে পড়ে। সাথে হাত পায়ে প্রচুর ব্যাথা করে।
অন্তরের পরিক্ষা শুরু হল। অনেক দিন পর মনে হয় সে ঘড় থেকে বের হয়ে পরিক্ষা দিতে গেল। তিব্র মাথা ব্যাথা নিয়ে সে পরিক্ষা দিতে গেল। কারো শরির দুর্বল হয়ে গেলে সেটার প্রভাব হাতের লেখার উপরেও পড়ে। তার জন্য অন্তরের হাতের লেখা প্রচন্ড রকমের খারাপ হল। তারমধ্যে চারটা পরিক্ষা দেওয়ার পর আসল তীব্র জ্বর। পরিক্ষার আগের সময়টাতে সে কিছুই পড়তে পারল না। অন্তরের পরিক্ষা সেবার অনেক খারাপ হল। তার বাবা এ প্লাস পাওয়ার আশা প্রায় ছেড়ে দিল।
অন্তরের মনটা অনেক খারাপ। অনেক কষ্ট করে সে পড়ালেখা করেছে এই কতদিন। এক মাসের মধ্যে সে অনেক মেধাবী হয়ে গেছিলো। কিন্তু শুধু মেধাবী হলেই চলবে না। সুস্থতার দিকেও তার খেয়াল রাখতে হবে। অন্তর ভেবেছিল, পরিক্ষার পরের সময়টা সে ক্রিকেট খেলে পার করে দিবে। কিন্তু অন্তরের শরিরে খেলার মতো শক্তি নেই। তাই খেলতেও ইচ্ছা করে না। এই কয়দিনেই ওর স্বভাবের অনেকটাই পরিবর্তন হয়ে গেছে। এদিকে তার বাবাও অনেক খুশি এই ভেবে যে, তার ছেলেটার খেলার প্রতি আসক্তি অনেকটাই কমে গেছে। ডাক্তার বলেছে, অন্তরের শরিরে ভিটামিন ডি এর ঘাটতি হয়েছে। যার কারণে শরির দুর্বল এবং হাত পায়ে ব্যথা করে। এর জন্য রোদে যেতে হবে। আর নিয়মিত খেলাধুলা করতে হবে।
কিন্তু অন্তরের এখন বাইরে কোথাও যেতে ইচ্ছা করে না। সেই আগের মতো বিছানায় শুয়ে-বসে থাকে। কারো সাথে কোন কথা বলতে চায় না। ছেলেটা যেন কেমন দিন দিন রোবটের মতো হয়ে যাচ্ছে। তার মা ছেলেকে নিয়ে চিন্তা করে। এমন ছেলে তো তারা আশা করে নি। তারা চেয়েছিল, তার ছেলেটা হাসিখুশি থাকুক। তার মা ছেলের কাছে গিয়ে বলে, সারাদিন এভাবে মন খারাপ করে বসে থাকিস কেন? তোর বন্ধুরা বাইরে খেলতে যায়। তোকে ডাকতে আসে প্রতিদিন। কিন্তু তুই যাস না।
- যেতে ইচ্ছা করে না।
- আগে তো খুব ইচ্ছা করতো। এখন তো আর কেউ তোকে পড়াশুনা করতে বলে না। সারাদিন অনেক সময়। যা। বাইরে যা। এভাবে ঘড়ে থাকলে তো দিন দিন অসুস্থ হয়ে যাবি।
- বললাম তো ইচ্ছা নেই।
তার মা আর কথা এগোয় না। চলে আসে ছেলের কাছ থেকে। যাওয়ার আগে বলে যায়, কিছু রান্না করে দিবো? খাবি?
- ক্ষুধা নেই আমার।
তার মা চলে যায়। মাঝে মাঝে পেছনের দিকে তাকায়। ভাবে, ছেলেকে অমনভাবে পড়াশুনায় চাপ দেওয়াটা ঠিক হয় নি। একটু বাইরে গিয়ে খেলত। রেজাল্টটা না হয় একটু খারাপই হলো। ডাক্তার নাহয় না-ই হলো। ছেলেকে যে ডাক্তারই হতে হবে এমন কোন কথা তো নেই। কিন্তু ছেলে যদি মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়ে যায়, তাহলে কেমন হবে?
আস্তে আস্তে অন্তরের রেজাল্ট দেওয়ার সময় হয়ে আসল। ছেলের রেজাল্ট নিয়ে বাবা মায়ের অনেক উত্তেজনা। তার বাবা ভেবে রেখেছেন ছেলে এইবার ভালো রেজাল্টই করবে। ছেলে তো অনেক পরিশ্রম করেছে। এ প্লাস না পেলেও রেজাল্ট তো ভালো হবারই কথা।
বাবা মায়ে চিন্তা কমলেও দেখা যাচ্ছে অন্তরের চিন্তা মোটেও কমছে না। খাওয়াদাওয়া করছেনা ঠিকমতো ছেলেটা। দিন দিন তার অবস্থার আরো অবনতি হতে লাগল। সারাক্ষন ছেলেটা একটা ভয়ের মধ্যে থাকে।
১৪ তারিখ। আজকে অন্তরের রেজাল্ট। তার বাবা চিন্তা করেছে, ছেলের জন্য মিষ্টি কিনে নিয়ে আসবে। ছেলেকে সে আর কষ্ট দিবে না এভাবে। তার মা তার জন্য ভালো ভালো খাবার রান্না করেছে। ছেলের রেজাল্ট যেমনটাই হোক, তারা ছেলেকে সারপ্রাইজ দিবে। ছেলেকে বুঝিয়ে বলতে হবে, তো যা ইচ্ছা তুই তাই হবি। অনেক বড় একজন খেলোয়ার হবি। তোকে টিভিতে দেখাবে। সবাই বলবে, অমুকের ছেলেকে টিভিতে দেখাচ্ছে। বিদেশ গিয়ে কী সুন্দর করে ইংলিশে কথা বলবে। ভেবেই তার মায়ের চোখে পানি চলে আসে।
অন্তরের বাবা মিষ্টি নিয়ে এসেছে বাসায়। মা অনেক কিছু রান্না করেছে। অন্তর দরজা বন্ধ করে শুয়ে আছে হয়তো। ছেলের তো চিন্তা হবারই কথা।
দুপুর ১২ টার দিকে অন্তরের রেজাল্ট বের হয়। খুব উৎসাহ নিয়ে ছেলের রোল নাম্বার দিয়ে ওয়েবসাইটে লগ-ইন করলো তার বাবা। আর কয়েক সেকেন্ড। কয়েকটা মুহুর্ত। তার পরেই স্ক্রিনে ভেসে উঠবে ছেলের রেজাল্ট। উৎসাহ। প্রবল উৎসাহ। মুখের কিঞ্চিত হাসি ফুটে উঠল তার বাবার। তার স্ত্রীর হাতে মোবাইলটা দিল।
A+... অন্তর A+ পেয়েছে। উল্লাস করে উঠল দুজনে। ছেলের সকল পরিশ্রম সফল। অন্তরের বাবাও আজকে বাইরে গেলে গর্বে বুক ফুলিয়ে বলতে পারবে, আমার ছেলে A+ পেয়েছে। ভেবেই তার মুখটা বার বার উজ্জ্বল হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু অন্তর কোথায়?
তার বাবা মিষ্টির প্যাকেট থেকে একটা মিষ্টি বের করে হাতে নিল। অন্তরের বাবার পেছনে পেছনে তার মা-ও গেল। ছেলের রুমের দরজাটা ধাক্কা দিয়ে খুলল। দরজাটা খুলতেই তারা দুজন একেবারে স্তব্ধ হয়ে গেল। অন্তরের বাবার হাত থেকে মিষ্টিটা নিচে পরে গেল। অন্তরের মা ধপাস করে ফ্লোরে বসে পড়ল। এমনটা তো তারা কখনো আশা করে নি।
১৪ তারিখ। আজকের দিনটা তাদের জীবনের সবচেয়ে কালো একটা অধ্যায়। সামনে অন্তরের লা*শ। ফাঁ*সি দিয়েছে অন্তর। তার বাবা ছেলের লাশের এক কোনে বসে আছে। তার চোখে পানি নেই। তার একমাত্র ছেলেটা যে পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছে, এই কথা সে বিশ্বাস করতে পারছে না। এইযে তার ছেলে, তার সামনে সুন্দর করে ঘুমিয়ে আছে। যেন একটু পরেই সে ঘুম থেকে উঠে পড়বে। উঠেই তার বাবাকে বলবে, বাবা! ব্যাট-টা পুরোনো হয়ে গেছে। কাল আসার সময় একটা নিয়ে এসো প্লিজ।
মিষ্টির প্যাকেটগুলো থেকে সেদিন আর কারো মিষ্টি খাওয়া হবে না। মায়ের বানানো পিঠাও কেউ আর খেতে আসবে না।
তার মা-ও অন্তরের দিকে তাকিয়ে আছে। এমনকি অন্তরও তার মায়ের দিকে তাকিয়ে আছে। নাহ। ছেলেটা তো মরে নি। অইজে বেঁচে আছে। অন্তরের মা স্পষ্ট খেয়াল করল, তার ছেলে তাকে মা বলে ডাকল। কাফনের কাপড়ে সাড়া শরির জড়ানো ছেলেটার। শুধু মুখটা খোলা আছে। অন্তর বলল, মা! আমাকে তোমরা মাফ করে দিও। তোমাদের স্বপ্নটা আমি পুরণ করতে পারলাম না। বাবাকেও আমার পক্ষ থেকে সরি বলে দিও। আর যদি আমার আবার কোন ভাইয়ের জন্ম হয়। তবে তার জীবনটা তাকেই গড়তে দিও।
অন্তরের মায়ের চোখ জুরে পানি। ছেলেটা এখনো তাকিয়ে আছে। আর বলছে, আমার খুব খারাপ লাগছে মা। এখানকার দুনিয়াটা কেমন যেন, সম্পুর্ণ নতুন একটা জগতে এসেছি মা। অন্তরের মা বলার চেষ্টা করল, কে বলেছে? তুই তো আমার পাশেই আছিস। কোথাও যাস নি তো। অন্তর হাঁসছে।
তার মা সবাইকে বলতে লাগল, অইযে আমার ছেলে বেঁচে আছে। ও মরে নি। ওইযে তাকিয়ে আছে। তোমরা এভাবে জীবিত ছেলেটাকে দাফন করো না। ওকে বের করো এখান থেকে। তার মা চিৎকার করে পাগলের মতো হয়ে গেল। অন্তরের বাবা তার স্ত্রীকে সেখান থেকে টেনে নিয়ে আসল। অন্তরের জানাজা হবে এখন। চলে যাবে একটা দেহ মাটির নিচে। সাথে একটা ক্রিকেটার হওয়ার স্বপ্ন।


Comments
Post a Comment